দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে যখন রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের লাখো পরিবার দিনে দুই বেলাও ঠিকমতো রান্না করতে পারছে না, শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তখন অবৈধ সংযোগ, গ্যাস চুরি, পাইপলাইনের লিকেজ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয়ের তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অনুমোদিত সিস্টেম লস বাদ দিলে প্রায় ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকার গ্যাস সরাসরি চুরির মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে, যা জ্বালানি খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস পর্যালোচনা বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সভার কার্যবিবরণীতে এ তথ্য উঠে এসেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
সরকার সিস্টেম লস কমাতে বিশেষ ‘১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বরং জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। গড় বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি টাকার গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা বছরে প্রায় ৬ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার সমান। অনুমোদিত ২ শতাংশ সিস্টেম লস বাদ দিলে প্রতিদিন প্রায় ১৪ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে, যার বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা।
গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে কারিগরি কারণে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি স্বাভাবিক। এর বেশি যে সিস্টেম লস হচ্ছে, তা মূলত অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির ফল।
সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস দেখা গেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লস বেড়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তিতাস কর্তৃপক্ষের দাবি, অবৈধ সংযোগ, পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ এবং আবাসিক খাতের অনিয়মের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও অল্প সময়ের মধ্যে আবার অবৈধ সংযোগ চালু হয়ে যায় এবং এর পেছনে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৭০ কিলোমিটার পাইপলাইন পরীক্ষা করে ৯ হাজার ৩৮৪টি লিকেজ শনাক্ত করেছে তিতাস। এতে বোঝা যায়, অবকাঠামোগত দুর্বলতাও গ্যাস অপচয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সরকার একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেই হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং চলতি বছরে তা ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাস চুরি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক পরিবার নির্ধারিত সময়ে রান্না করতে পারছে না। শিল্পকারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে। অথচ একই সময়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে-এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি বিভাগ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পৃক্ত করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিতসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সরকারের নেওয়া কর্মপরিকল্পনা সত্ত্বেও যদি বছরের পর বছর একইভাবে গ্যাস চুরি চলতে থাকে, তাহলে জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে-তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


