নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চুরির অভিযোগ তুলে দুই দিন অবৈধভাবে আটকে রেখে এক রংমিস্ত্রির ওপর চালানো হয়েছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অভিযোগ, কাঠের টুকরো দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে, বিদ্যুতের শক দিয়ে এবং হাতের কবজি ও আঙুল ভেঙে দেওয়া হয় তাকে। ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের পর চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিহত নয়ন হাওলাদার (৪২) পেশায় একজন রংমিস্ত্রি। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, নয়ন স্ত্রী আমেনা আক্তার শিমুকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল তাঁতখানা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রায় এক মাস ধরে তিনি ফতুল্লার দক্ষিণ শিয়াচর এলাকার নুরুল ইসলামের বাড়িতে রংয়ের কাজ করছিলেন।

নিহতের স্ত্রী আমেনা আক্তার শিমুর অভিযোগ, গত ১৪ জুলাই সকালে কাজে যাওয়ার পর রাতে নুরুল ইসলাম ফোন করে দাবি করেন, তার ঘর থেকে ৫০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং নয়ন সেই টাকার জন্য দায়ী। টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়।

স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে পরদিন নিজের কানের স্বর্ণের দুল বন্ধক রেখে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান শিমু। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও নয়নকে মুক্তি না দিয়ে তার ওপর আরও ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ। শিমুর ভাষ্য, নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা নয়নের বুকের ওপর বসে কাঠের টুকরো দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। পরে পরিবারের আরেক সদস্য সিরাজুস সালেকিন বিদ্যুতের তার দিয়ে শরীরে শক দেন এবং বাম হাতের কবজি ও আঙুল মুচড়ে ভেঙে দেন। একপর্যায়ে নির্যাতনে নয়নের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লেও নির্যাতন থামেনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বামীকে হত্যা না করার জন্য অভিযুক্তদের পায়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করলেও তারা আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে সেই টাকা জোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে ১৬ জুলাই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় নয়নকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। টানা ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে মঙ্গলবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, নয়নের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রীর দায়ের করা হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাকে দুই দিন অবৈধভাবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

স্বামীকে হারিয়ে শোকাহত আমেনা আক্তার শিমু বলেন, চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করে সর্বস্ব ব্যয় করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। যারা নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version