ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলামের কলাম
দেশের বাজারে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। গত রোববার ( ২০ সেপ্টেম্বর ) রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
যার ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় এক মারাত্মক আঘাত এনেছে। ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন খাতেই প্রভাব ফেলবে না, বরং তা কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে এক অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে। বর্তমান সরকার যখন বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে বা লোকসান কমানোর অজুহাতে জনগণের পকেট কাটার এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন দেশের আপামর জনসাধারণের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগছে—জনকল্যাণের নৈতিক দায়িত্ব কি রাষ্ট্র পুরোপুরি ভুলে গেল? বিরোধী দলে থাকাকালীন যারা তেলের দাম সামান্য বাড়ালেও রাজপথ কাঁপাতেন, আজ তারা ক্ষমতায় বসে জনগণের দুর্ভোগের মুখে কেবল ‘বিকল্প ছিল না’ বলে হাত ধুয়ে ফেলছেন।
বিএনপি ও বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতার সমালোচনা:
জ্বালানি খাতের এই নড়বড়ে পরিস্থিতি বর্তমান নীতিনির্ধারক ও বিএনপির রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবকে চরমভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির দামে ওঠানামা চলে, তখন একটি দূরদর্শী সরকার ভর্তুকি বা বিকল্প উৎস খোলার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই পথে না হেঁটে জনগণের ওপর সরাসরি কর বা মূল্যের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের এই সিদ্ধান্ত সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ মানুষের আয় যেখানে স্থবির, সেখানে হঠাৎ করে এই বিপুল মূল্যবৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যা তীব্র জনঅসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
অতীত সংকটে আওয়ামী লীগ সরকারের সফল ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শিতা:
এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ দেশের মানুষ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও সফল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কথা স্মরণ করছে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল। বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল, তখনও শেখ হাসিনার সরকার দেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি ভর্তুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দেশের কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে কৃষকদের সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সেই নীতি ছিল মূলত ‘জনবান্ধব নীতি’, যেখানে বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
অবকাঠামো ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সাফল্য:
জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সাফল্যে আওয়ামী লীগ সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার শুধু তেল আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্ট এবং মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের শতভাগ শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের যে রূপরেখা আওয়ামী লীগ বাস্তবায়ন করেছিল, তা আজ বর্তমান সরকারের ভুল নীতি ও অদূরদর্শিতার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হতে হবে জনগণের কল্যাণ সাধন, তাদের সংকটে ফেলা নয়। বর্তমান সরকারের এই ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয় যে, জনস্বার্থের চেয়ে তাত্ত্বিক অর্থনৈতিক অজুহাত তাদের কাছে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। অতীত আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে বৈশ্বিক সংকট বুক দিয়ে আগলে রেখে দেশের মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল, আজ সেই জনবান্ধব দর্শনের বড় অভাব। দেশের অর্থনীতিকে স্ট্যাগফ্লেশন বা দীর্ঘমেয়াদী মন্দা থেকে বাঁচাতে হলে বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং ভর্তুকি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি শান্ত করাই হবে এই মুহূর্তের একমাত্র যৌক্তিক পদক্ষেপ।


