পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ফেরার প্রস্তুতি, কলকাতায় জড়ো হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা
কথিত এবং সাজানো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে ক্যাঙারু কোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং জঙ্গী হামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
আওয়ামী লীগের ইউরোপ শাখার নেতা আব্বাস চৌধুরী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম TIMES-কে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে তার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে পারেন। জঙ্গী হামলার পরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হতে পারে তার প্রথম বড় ধরনের প্রকাশ্য উপস্থিতি।
আব্বাস চৌধুরীর দাবি, শেখ হাসিনা তাঁকে জানিয়েছেন, ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Wall-কে দেওয়া সাম্প্রতিক এক বক্তব্যেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও বলেছেন।
কলকাতায় জড়ো হচ্ছেন নেতারা
TIMES-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের অন্তত ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিদেশে অবস্থানরত দলটির অনেক নেতা-কর্মী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৬০ জন আওয়ামী লীগ নেতা ইতোমধ্যে কলকাতায় অবস্থান করছেন। সেখানে তারা নিয়মিত বৈঠক, অনলাইন কার্যক্রমের সমন্বয় এবং দলীয় কর্মীদের সক্রিয় থাকার নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, আরও প্রায় ২০ জন কেন্দ্রীয় নেতা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের আরও নেতারা ডিসেম্বরের আগে কলকাতায় গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে আব্বাস চৌধুরী জানিয়েছেন।
লন্ডনে অবস্থানরত সাবেক সিলেট সিটি করপোরেশন মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের নিয়ে চার্টার্ড বিমানযোগে দেশে ফেরার পরিকল্পনাও তারা করছেন।
‘নেত্রীর সঙ্গে দেশে ফিরতে চাই’
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, দলটির নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার কোনো বিকল্প নেই। তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনার নির্দেশই তাদের কাছে চূড়ান্ত।
দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নানা সংশয় তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরেছিলেন। এবারও তিনি ফিরবেন বলে আশা করেন তিনি।
কথিত সরকার অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা
শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে বিএনপি সরকার তাঁকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিষয়টি বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক মহলেরও নজরে এসেছে। দলটির কয়েকটি টিম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
দিল্লি থেকে কলকাতা, এরপর বাংলাদেশ
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লি থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ এবং আজমের শরিফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহ জিয়ারত করতে পারেন।
তাঁর সঙ্গে বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কথি ছাত্র-জনতার নামে ব্যাপক জঙ্গী হামলার মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যান এবং এরপর থেকে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন ভারতের আতিথেয়তা নিয়ে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠক, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া শুরু করেন এরপর থেকেই। পরে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেন তিনি।
দেশে ফিরলে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন?
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গ্রেপ্তার বা কারাবন্দি হলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কে থাকবেন এ নিয়েও দলটির ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে TIMES-এর সঙ্গে কথা বলা অন্তত ছয়জন আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছেন এমন কোনো বক্তব্য তিনি দেননি। দলীয় নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে প্রেসিডিয়ামের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
দলটির কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মারা গেছেন। অন্যদিকে কাজী জাফরউল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, ফারুক খান ও শাহজাহান খান কারাগারে রয়েছেন। দেশের বাইরে অবস্থান করছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান ও খায়রুজ্জামান চৌধুরী লিটন।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা অনুপস্থিত থাকলে দেশে থাকা প্রেসিডিয়ামের জ্যেষ্ঠতম সদস্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নিতে পারেন। পাশাপাশি দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন মুখপাত্রও নিয়োগ করা হবে।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট তারিখ এবং তাকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না এসব বিষয়ে এখনো সরকারি পর্যায়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।


