দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত বা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া স্বাভাবিক হলেও, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতাদর্শের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধভাবে শিক্ষকদের চিহ্নিত ও হয়রানি করা হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও একাডেমিক স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পৃথক তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠনের খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বহু শিক্ষকের নামের তালিকা নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কোনো শিক্ষককে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না। কারণ, তদন্তের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য উদঘাটন; কাউকে আগেভাগেই দোষী সাব্যস্ত করা নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ বিধি ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, মতাদর্শ কিংবা অতীত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, যুক্তিবোধ, মতপ্রকাশ ও মুক্তচিন্তার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের পরিবেশ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে শিক্ষকরা যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চাকরি হারানোর আশঙ্কা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে থাকেন, তাহলে তার প্রভাব পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও শিক্ষক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা প্রণয়ন ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার আগেই কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দায়মুক্ত থাকবেন। দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা, অসদাচরণ কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষকদের সংগঠনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। একসময় বিরোধী মতাদর্শের শিক্ষকরা হয়রানির শিকার হয়েছেন- এমন অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নতুন করে কোনো শিক্ষককে হয়রানি করা হলে সেটিও সমানভাবে নিন্দনীয়। অতীতের অন্যায়ের প্রতিশোধ হিসেবে নতুন অন্যায় প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য স্বাধীন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র। তাই রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের ‘পক্ষ’ ও ‘বিপক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেকোনো তদন্ত হতে হবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। তদন্তকারী কমিটিকেও হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তালিকাভুক্ত করে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

শিক্ষাঙ্গনে জবাবদিহি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও একাডেমিক স্বাধীনতা। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও শাস্তিমূলক কার্যক্রমে যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা দলীয় বিবেচনা প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষাঙ্গনে তদন্তের নামে প্রতিশোধের সংস্কৃতি নয়-চাই স্বচ্ছতা, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চার নিরাপদ পরিবেশ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version