আদালতের নির্দেশের পরও শিশুটি অধরা, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ

একজন মায়ের বুক থেকে সন্তান কেড়ে নেওয়ার পর কেটে গেছে তিন মাস। সন্তান কোথায়, কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না- কিছুই জানেন না মা সুরাইয়া আক্তার। আদালতের নির্দেশে মামলা হলেও শিশুটিকে উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ পরিবারের। এরই মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে চরম দুর্ব্যবহার, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং ভুক্তভোগী মাকে অপমান করার গুরুতর অভিযোগ।

ভুক্তভোগী মায়ের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশের কথা জানালে চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুহাম্মদ ফারুক হোসেন তাকে বলেছেন, ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’ যদিও পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শিশুটিকে উদ্ধারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ জুবাইরের সঙ্গে সুরাইয়া আক্তারের বিয়ে হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তাদের ছেলে মো. আবু হুরাইরা জুরাইজের জন্ম। তবে যৌতুককে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহের জেরে ২০২২ সালের ২৭ জুন তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

বিচ্ছেদের পর শিশু জুরাইজকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান সুরাইয়া। চলতি বছর শিশুটিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার মুঈনুল ইসলাম নুরানি মাদ্রাসায় প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। ভর্তির জন্য জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজন হলে শিশুটির বাবা তা তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধনের কপি সংগ্রহের জন্য শিশুটির চাচা মো. ইদ্রিস সুরাইয়াকে চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় তার বাসায় যেতে বলেন। গত ৮ জুন শিশু জুরাইজকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান সুরাইয়া। বাসার সামনে পৌঁছামাত্র ইদ্রিস জোরপূর্বক তার কোল থেকে শিশুটিকে কেড়ে নেন বলে অভিযোগ।

এরপর শিশুটির মাকে মারধর করে বাড়ির বাইরে রাস্তায় অচেতন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

ঘটনার পর সুরাইয়া আক্তারের মেসেঞ্জারে মুন্না হাসান নামে এক ব্যক্তি শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য পুলিশে অভিযোগ বা মামলা করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ভুক্তভোগী প্রথমদিকে থানায় মামলা করতে সাহস পাননি।

পরবর্তীতে আইনি সহায়তা নিয়ে গত ২৩ আগস্ট চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর পিটিশন মামলা নম্বর ৫৯/২০২৬-এর আদেশের ভিত্তিতে চান্দগাঁও থানায় মামলা করা হয়। মামলার পর ২৬ আগস্ট কামাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ইদ্রিসের স্ত্রী উর্মি আক্তারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি শিশুটির চাচি।

তবে পরিবারের অভিযোগ, একজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও অপহৃত শিশুটির সন্ধান এখনো মেলেনি। শিশুটির অবস্থান শনাক্ত করে তাকে উদ্ধারে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

সুরাইয়া আক্তারের বড় বোন সুফিয়া আক্তার কলি বলেন, ভাগিনাকে অপহরণের পর থেকেই তার বোন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। দিনে কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে অচেতন হয়ে যাচ্ছেন। শনিবার সন্ধ্যায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টিকে পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন এবং শিশুটিকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

অন্যদিকে সুরাইয়া আক্তারের ভাষ্য, জন্মের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানকে নিজের হাতে বড় করেছেন তিনি। শিশুটি মায়ের হাত ছাড়া অন্য কারও হাতের খাবারও খেতে চাইত না। সেই সন্তানকে হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় আছে, কীভাবে আছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে- কিছুই জানি না। আদালতের নির্দেশের পরও যদি সন্তান উদ্ধার না হয়, তাহলে আমি কার কাছে যাব? একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদও কি পুলিশের কাছে কোনো মূল্য রাখে না?’

শিশুটির মায়ের অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শুরু থেকেই আসামিদের সঙ্গে মিলে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। আদালতের নির্দেশের বিষয়ে কথা বললে তাকে দায়িত্বহীন মন্তব্য করা হয় বলে দাবি তার।

সুরাইয়ার অভিযোগ, তাকে বলা হয়েছে-‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’ এমনকি তার বাবা ও ভাই নেই, মামলা কে চালাবে এবং আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন কেন- এসব নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া হিজাব ও নেকাব পরা নিয়েও তাকে অপমানজনক কথা শুনতে হয়েছে বলে দাবি সুরাইয়ার। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

অভিযোগের বিষয়ে চান্দগাঁও থানার এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, বাদীর সঙ্গে তিনি কোনো খারাপ আচরণ করেননি। বরং শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য মামলার দ্বিতীয় আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার প্রথম আসামি চট্টগ্রামের বাইরে থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘ভিকটিমকে উদ্ধারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

একটি শিশু অপহরণের অভিযোগ, মায়ের ওপর হামলা এবং আদালতের নির্দেশের পরও শিশুটির সন্ধান না মেলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ও ভুক্তভোগীকে অপমান করার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন মায়ের প্রতি অবমাননাই নয়, বরং পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব, মানবিকতা ও জবাবদিহির বিষয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।

অপহৃত শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। একই সঙ্গে তদন্তে গাফিলতি বা অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version