জ্বালানি খাত কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড। শিল্প, পরিবহন, কৃষি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা সবখানেই জ্বালানির অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আজ বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক ভয়াবহ সংকটে নিমজ্জিত। এখানে সুশাসন ও জবাবদিহির জায়গা দখল করেছে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা।

তেল চুরি, সরবরাহে ঘাটতি, পাইপলাইনে পানি মেশানো, এমনকি কারাবন্দি কর্মকর্তার নামে অফিসে হাজিরা দেওয়ার মতো অনিয়ম এখন আর গোপন কিছু নয়। এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও নাগরিক আস্থার উপর সরাসরি আঘাত।

সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তাদের অধীন দপ্তরগুলোকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক অঙ্গনে গুঞ্জন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান পদ নিয়োগে লেনদেন হয়েছে ১০০ কোটিরও বেশি টাকায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে, আর সেই অর্থ উদ্ধার করতেই শুরু হচ্ছে তেল বাণিজ্যে কারসাজি ও অবৈধ লেনদেন।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কেবল অনৈতিকই নয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। পাইপলাইন থেকে তেল গায়েব হচ্ছে, গুদামে চুরি হচ্ছে সরকারি তেল, এমনকি তেলের সঙ্গে পানি মিশিয়ে বিক্রির মতো প্রতারণাও চলছে নির্লজ্জভাবে। এইসব অপকর্মের পেছনে রয়েছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে বহাল তবিয়তে এসব অপরাধ করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতে এই দুর্নীতি কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা তদবির সংস্কৃতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শাস্তিহীনতার পরিবেশ এই খাতকে ধীরে ধীরে পঙ্গু করে ফেলেছে। ফলে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা উপেক্ষিত, আর দুর্নীতিবাজরাই দখল নিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো।

একজন জ্বালানি বিশ্লেষকের ভাষায়, “তেল খাতে দুর্নীতি মানে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সরাসরি লুণ্ঠন। জনগণের করের টাকায় কেনা তেল যদি পাইপলাইনে চুরি হয় বা পানিতে মিশে বিক্রি হয়, তাহলে এর দায় গোটা প্রশাসনিক কাঠামোকেই নিতে হবে।”

দুর্নীতি আজ আর কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করছে। জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হচ্ছে, আস্থা হারিয়ে ফেলছে বিনিয়োগকারীরা, আর অর্থনীতি ক্রমে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় প্রয়োজন অবিলম্বে কাঠামোগত সংস্কার ও কঠোর নজরদারি। নিয়োগ থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা ছাড়া বিকল্প নেই যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন।

ড. ইউনুসে নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নিয়োগ বাণিজ্য এবং দুর্নীতির এই সংস্কৃতি রোধে নীতিনির্ধারক পর্যায়েই প্রয়োজন ছিল দৃঢ় অবস্থান যা দেখা যায়নি।

জ্বালানি খাতকে দুর্নীতির জাল থেকে মুক্ত করা মানে শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সততা, সুশাসন ও জাতির মর্যাদা পুনরুদ্ধারেরও প্রতীক। আজ সময় এসেছে সেই দায়বদ্ধতা দেখানোর যাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে জ্বালানি খাত আবার দাঁড়াতে পারে শক্ত ও স্বচ্ছ ভিত্তির উপর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version