মানস ঘোষের কলাম
Deccan Chronicle-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ওয়াজেদের দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে দেওয়া অডিও ভাষণকে একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘Return of Hasina: Mission Possible?’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা এই মঞ্চ ব্যবহার করে দেশবাসী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণ ও সরকারের কাছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্পের কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে ধ্বংসের পথ থেকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার একটি রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং প্রায় ১,৫০০টি পোশাক ও অন্যান্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে চরম দুর্ভোগে থাকা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করাও তাঁর বার্তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Deccan Chronicle-এর ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব পরিস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক দরিদ্রতা সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশের অভিজাত শ্রেণিও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে সেখানে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার রূপরেখার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (DICT) আত্মসমর্পণ করা, যাতে তাঁর বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত বিচারিক প্রহসন প্রকাশ্যে আনা যায়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি “দুর্নীতিগ্রস্ত আদালত” তাঁর বিচারকে প্রভাবিত করে প্রহসনমূলক রায় দিয়েছে।
Deccan Chronicle-এর প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ৫ কোটিরও বেশি মানুষ যাদের প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশের শেখ হাসিনার কণ্ঠ শুনেছেন। এটিকে এক অর্থে একটি রেকর্ড হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, এই ঘটনা বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে উদ্বেগ ও অস্বস্তিতে ফেলেছে। বাংলাদেশের দেশীয় সংবাদমাধ্যমকে অনুষ্ঠানটি প্রচার করতে নিষেধ করা হলেও জনগণ সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার বক্তব্য শুনেছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকার শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ছিল ৩০ শতাংশ, যা বর্তমানে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি এবং আইনজ্ঞ মোহসিন রশিদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার অতীত কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া থেকে একমাত্র তিনিই রক্ষা করতে পারেন। তিনি একসময় হাসিনার কঠোর সমালোচক ছিলেন বলেও উল্লেখ করে বলেন, এখন তিনি তাঁর অন্যতম দৃঢ় সমর্থক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিষয় তারেক রহমানের সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। বরং এর মাধ্যমে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এখনও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুবএমন একটি বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
দিল্লির অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তাঁর সাবেক মন্ত্রী নওফেলও বক্তব্য রাখেন। তাঁরা পুনরুত্থানশীল ইসলামী জঙ্গিবাদের কারণে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেন। তাঁদের বক্তব্যে আইএসআইএস ও খেলাফতপন্থীদের মিছিল, কালেমার পতাকা প্রদর্শন এবং বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার অভিযোগও উঠে আসে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনাগুলো শেখ হাসিনা যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা দেশবাসীকে কথিত “ছাত্র বিপ্লব” সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। পুলিশ সদস্য নিহত, পুলিশ স্টেশন ও ঢাকা মেট্রোর স্টেশন পুড়িয়ে দেওয়া, অস্ত্র লুট এবং কারাগারে হামলার বিষয়ও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নাম চার খলিফার নামে পরিবর্তন এবং সামরিক ক্যান্টনমেন্টে ইসলামী প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে ১৯৭১ সালের শহীদ সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত “শিখা অনির্বাণ” নিভিয়ে দেওয়ার দাবিও সেখানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, ভারতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন দূত সার্জিও গোরের মধ্যে শেখ হাসিনার নিরাপদে ঢাকায় ফেরার বিষয়ে কয়েক দফা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতৈক্য বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়টিও দিল্লি ও ওয়াশিংটনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবশেষে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অব্যাহত সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক অবনতিতে জর্জরিত একটি দেশ তারেক রহমান দীর্ঘদিন শাসন করতে পারবেন কি না। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে তারেক রহমানের প্রস্তাবিত দিল্লি সফরের সঙ্গে শর্তযুক্ত করার বিষয়টিকেও প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মানষ ঘোষ
প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক


