ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গড়কাটি গ্রামে ঘটে যাওয়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আবারও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযুক্ত তরুণকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরও থামেনি উত্তেজিত জনতার তাণ্ডব। হামলাকারীরা একের পর এক বাড়িঘর, মন্দির ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়, লুটপাট করে এবং বহু পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একটি উন্মত্ত গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকেই এলাকার পরিচিত মানুষ ছিলেন না; আশপাশের এলাকা থেকে আসা বহু অচেনা মুখও সেখানে দেখা গেছে।
নিখিল রায়ের ছেলে সুদীপ্ত রায়ের একটি ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি শান্ত করতে নিখিল রায় নিজেই ছেলেকে নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতে বাদাঘাট বাজারে যান। পরে জনতার চাপ বাড়তে থাকলে দোকান ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন নিজের দোকানের শাটার নামিয়ে সুদীপ্তকে রক্ষা করেন। পরে পুলিশ গোপনে তাকে থানায় নিয়ে যায়।
কিন্তু অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কয়েকশ মানুষ মিছিল নিয়ে গড়কাটি গ্রামে প্রবেশ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকান ও মন্দিরে হামলা চালায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একই দিনে কয়েক দফায় হামলা হয় এবং বহু ঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কেতকী রায় বলেন, তাদের ঘরের আসবাবপত্র, টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে। টিউবওয়েল, পানির মোটর, ঘরের দেয়াল, টিনের বেড়া-কিছুই রক্ষা পায়নি। তাদের ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গড়কাটি গ্রামের সার্বজনীন মন্দির, কালীমন্দির, দুর্গামন্দির ও নাটমন্দিরেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। বড় বড় হাতুড়ি দিয়ে নাটমন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিমা ভাঙচুর, পূজার সামগ্রী নষ্ট এবং মন্দিরের বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস লুটের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে-যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশের হেফাজতে ছিলেন, তখন কেন নিরীহ পরিবার ও উপাসনালয় হামলার শিকার হলো?
স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষই এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি নজরুল সিকদার বলেন, বহু বছর ধরে এ এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল। এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদারও বলেন, এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন।
হামলার সময় সুদীপ্তকে রক্ষা করা ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন বলেন, আশ্রয় নেওয়ার পর জনতা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি দোকানের শাটার বন্ধ করে দেন। পরে বাজার কমিটি ও পুলিশের সহযোগিতায় সুদীপ্তকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। মিছিলে বিপুলসংখ্যক অপরিচিত ব্যক্তি এবং বাইরে থেকে আসা লোকজনকে দেখা গেছে বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। এতে ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
গড়কাটি এমন একটি জনপদ, যেখানে প্রতিবছর অদ্বৈত আচার্যের আশ্রমকে ঘিরে বারুণী স্নান উৎসব এবং পাশের শাহ আরেফিন (র.)-এর মাজারে ওরশ একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। বছরের পর বছর দুই ধর্মের মানুষ মিলেমিশে এসব আয়োজন সফল করে আসছেন। সেই সম্প্রীতির গ্রামেই এমন হামলার ঘটনা স্থানীয়দের হতবাক করেছে।
এদিকে সুদীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বাবা-মায়ের অভিযোগ, এইচএসসি পরীক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তাঁদের আশঙ্কা, একটি ঘটনার কারণে ছেলের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ থাকলে তার বিচার আদালতেই হওয়া উচিত; কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা নিরীহ মানুষ ও উপাসনালয়ে হামলার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।


