আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

ক্ষমতার শীর্ষ থেকে কংগ্রেসের কাঠগড়ায় যাওয়ার পথে ডোনাল্ড ট্রাম্প

আমেরিকার রাজনীতিতে নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন নয়, অনেক সময় এটি হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে জনগণের নীরব গণভোট! ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই অর্থে ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে আমেরিকানরা শুধু কংগ্রেসের আসন নির্ধারণ করবেন না, তারা অনেকটা নির্ধারণ করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়টি কতটা নির্বিঘ্ন হবে, নাকি হোয়াইট হাউসকে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য কংগ্রেসের কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে নাকি ট্রাম্প অভিশংসনের মুখে পড়বেন!

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেই এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর ফোকালডাটা জরিপে তার অনুমোদন ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একই জরিপে ৫৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ট্রাম্পের অধীনে তারা আর্থিকভাবে আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন। জাতীয় পর্যায়ের ‘জেনেরিক ব্যালটেও’ ডেমোক্র্যাটদের ৭.৫ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান দেখানো হয়েছে। এখানেই ট্রাম্পের জন্য বিপদের ঘণ্টা! কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত প্রেসিডেন্টের দলের ওপর ভোটারদের অসন্তোষের প্রভাব পড়ে। কিন্তু এবার সেই অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শুল্কনীতি, জ্বালানির দাম, অভিবাসননীতি এবং বিদেশনীতি নিয়ে বিতর্ক। এমনকি রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যেও একটি প্রশ্ন ক্রমশ বড় হচ্ছে ট্রাম্পকে সামনে রেখে নির্বাচনে যাওয়া কি আশীর্বাদ, নাকি বোঝা?

সাম্প্রতিক সময়ে এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে যে কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী স্থানীয় ইস্যুতে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরতে চাইছেন, অথচ ট্রাম্প জাতীয় নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাইছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতি ও বক্তব্য অনেক রিপাবলিকান প্রার্থীর জন্য নির্বাচনী বার্তা আরও জটিল করে তুলছে।

অভিশংসনের ছায়া কি ফিরছে?

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমেরিকা দুবার অভিশংসনের নাটক দেখেছে। দুবারই তিনি সিনেটে খালাস পেয়েছিলেন। ২০২০ সালে সিনেটে ৪৮ জন তাকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, আর ২০২১ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ৫৭। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পাওয়ায় তিনি পদচ্যুত হননি। সুতরাং ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় অভিশংসন মানেই ক্ষমতাচ্যুতি নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের Article II, Section 4 অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ অথবা “high Crimes and Misdemeanors”-এর জন্য অভিশংসন ও দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরানো যেতে পারে। হাউস অভিশংসনের অভিযোগ আনে; সিনেট বিচার করে এবং দোষী সাব্যস্ত করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। অর্থাৎ নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্পকে সরাসরি হোয়াইট হাউস থেকে সরাবে না। কিন্তু কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক নিরাপত্তা নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।

ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু কখনও কখনও ক্ষমতাই

ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, আদালতকে অমান্য করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া কিংবা সংবিধানকে দুর্বল করার অভিযোগ এসবকে সরাসরি সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত পৃথক নয়টি অভিশংসন-ধারা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু এগুলো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়: ‘একজন প্রেসিডেন্ট কত দূর পর্যন্ত নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন?’ আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অন্যতম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলো কংগ্রেস।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি রাজনৈতিক বিতর্কের সীমা ছাড়িয়ে প্রমাণযোগ্য অসদাচরণের পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কংগ্রেস তদন্ত করতে পারে, সাক্ষ্য চাইতে পারে, নথি তলব করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে অভিশংসনের প্রস্তাব আনতে পারে। আমেরিকার সংবিধানই কংগ্রেসকে এই ‘checks and balances’-এর ক্ষমতা দিয়েছে।

হাউস কি বদলে যেতে পারে?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় লড়াই হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসকে ঘিরে। ৪৩৫টি হাউস আসনই নির্বাচনের আওতায় থাকবে এবং ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে তুলনামূলক অল্প কয়েকটি আসন বদলালেই যথেষ্ট হবে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে প্রায় ৫০টি হাউস আসনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিনেটের লড়াইও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চারটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আসন দখল করতে হবে। নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, টেক্সাস, আইওয়া, মেইন, জর্জিয়া, ওহাইও এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো রাজ্যগুলো তাই জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

এখানে একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলে শুধু ট্রাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন সেই সব রিপাবলিকান প্রার্থীও, যাঁদের আসন জয়ের জন্য মধ্যপন্থী ও স্বাধীন ভোটারদের প্রয়োজন।

তবে ট্রাম্পকে এখনই ‘শেষ’ বলে দেওয়া ভুল

রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুল হলো আগাম বিজয় ঘোষণা। রিপাবলিকানদের হাতে এখনও অর্থ, সংগঠন, শক্তিশালী ভোটব্যাংক এবং রাজনৈতিক অবকাঠামোর বড় সুবিধা রয়েছে। সাম্প্রতিক এক রয়টার্স প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, রিপাবলিকান কংগ্রেশনাল কমিটিগুলো ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে এমন দাবি করা যায়; কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার আগে তার পতন নিশ্চিত বলা যায় না। বরং নভেম্বরের নির্বাচন হবে জনমত, অর্থনীতি, সাংগঠনিক শক্তি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের মধ্যে এক কঠিন সংঘর্ষ। নভেম্বর তাই শুধু নির্বাচন নয়, একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ পরীক্ষা।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটি নয় যে তিনি কতটা জনপ্রিয়। প্রশ্ন হলো তিনি কতটা ক্ষমতাবান থাকবেন! কারণ একজন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক শক্তি শুধু হোয়াইট হাউসে বসে থাকা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার সামনে কংগ্রেস কী করছে, আদালত কী বলছে, নিজের দলের আইনপ্রণেতারা কতটা অনুগত এবং জনগণ তাঁর নীতিকে কতটা অনুমোদন করছে এসবই ক্ষমতার প্রকৃত পরিমাপক।

আর নভেম্বরের নির্বাচন যদি কংগ্রেসের ভারসাম্য বদলে দেয়, তাহলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের গল্পও বদলে যেতে পারে। আজ যে প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশে দেশ চালাচ্ছেন, আগামীকাল তাকেই হয়তো কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সামনে তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে। আজ যাঁরা তার পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন, আগামীকাল তাদের কেউ কেউ হয়তো রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব তৈরি করতে পারেন। আর সেখানেই ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হচ্ছে ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তখনই আসে, যখন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে তার চারপাশের মানুষগুলো আর তাকে রক্ষা করার চেয়ে নিজেদের আসন রক্ষায় বেশি ব্যস্ত।

নভেম্বরের ভোট তাই ট্রাম্পকে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করার ভোট নয়। কিন্তু এটি হতে পারে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর আমেরিকান জনগণের সবচেয়ে কঠিন ‘চেক’। হাউস বদলালে শুরু হতে পারে তদন্তের নতুন অধ্যায়। সিনেট বদলালে বদলাতে পারে আইন, নিয়োগ ও অভিশংসনের রাজনৈতিক সমীকরণ।
আর জনমতের ধাক্কা যদি রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরেই ফাটল তৈরি করে, তখন হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় সংকট আসতে পারে বিরোধী দল থেকে নয়, নিজ দলের ভেতর থেকেই।

তাই নভেম্বরের প্রশ্ন একটাই- ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আরও একবার নিজের রাজনৈতিক মুঠোয় রাখবেন, নাকি আমেরিকার সাংবিধানিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরবে?

৩ নভেম্বরের ব্যালট হয়তো সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর দেবে।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version