আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম Trading Economics-এর প্রকাশিত Terrorism Index অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের প্রভাবের বিচারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। সূচকে দেশটির স্কোর ৮.৫৭, যা তালিকার সর্বোচ্চ। পাকিস্তানের পর রয়েছে বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজেরিয়া, মালি, সিরিয়া, সোমালিয়া, কঙ্গো, কলম্বিয়া, ইসরায়েল, আফগানিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ। অন্যদিকে, একই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম, যা তুলনামূলকভাবে প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান জঙ্গিবাদ, আত্মঘাতী হামলা, ইসলামী উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশটির অর্থনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, পর্যটন, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসবাদ যখন একটি রাষ্ট্রের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন তার ক্ষতি শুধু নিরাপত্তা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনে বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই দেশটি আন্তর্জাতিক সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছিল। তবে গত ৫ই অগাষ্ট, ২০২৪-এর পর এই অবস্থান ক্রমশ তলানীতে। পূর্ব অবস্থান ধরে রাখতে হলে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান সবসময় দৃঢ়, ধারাবাহিক এবং নিরপেক্ষ হতে হবে।
এদিকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সতর্কবার্তা আছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার ধরন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পাকিস্তানের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে যদি সেই দেশের নীতিকেই অনুসরণ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ও ইসলামী উগ্রবাদের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যে পাকিস্তান নিজেই সন্ত্রাসবাদের আতুড়ঘর, সেই পাকিস্তান মডেলে বিএনপির এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশকে অন্ধকারে পতিত করার সামিল।
সরকারের অবস্থান থাকতে হয় সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এবং দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করতে।
পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যে কোনো সরকার বা রাজনৈতিক শক্তির জন্যই সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কারণ একটি দেশের শক্তি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; আইনের শাসন, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও অগ্রগতির স্বার্থে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
পাকিস্তান এক বাফার রাষ্ট্র, সন্ত্রাসবাদের প্রাতিষ্ঠানিক রুপ। পাকিস্তান মডেলে বিএনপির এগিয়ে যাওয়া জনগণেরই রুখে দাড়াতে হবে। নইলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবেনা কোনোভাবেই। সারাবিশ্ব যখন সন্ত্রাস আর জঙ্গীবাদের সূতিকাগার পাকিস্তানকে উপেক্ষা করছে, আমাদের বিএনপি সরকার সেই পাকিস্তানের দিকেই বাংলাদেশকে এগিয়ে দিচ্ছে, যা নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশ-বিরোধী অপকাজ। এই চেষ্টা রুখতেই হবে।।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক


