বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলপ্রেম, আতিথেয়তা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সৌজন্য সাক্ষাতে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, আর্জেন্টিনার ডেপুটি হেড অব মিশন প্যাট্রিসিও উরুয়েনিয়া প্যালাসিও, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ আমেরিকা অনুবিভাগের পরিচালক কাজী আনারকলী এবং উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক বন্ধনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করা হয়।
রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেন, “আর্জেন্টিনার মানুষ মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সবচেয়ে বেশি চেনে। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য গুণী লেখকদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কেও আমরা জানতে আগ্রহী।”
তিনি বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যকর্ম স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদের আহ্বান জানান এবং আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ‘বুয়েনস আইরেস আন্তর্জাতিক বইমেলা’-য় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করেন।

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট লালন শাহের গানের প্রশংসা করে বলেন, লালনগীতি স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি নতুন মাত্রায় বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি পাবে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আর্জেন্টিনার সমর্থন এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে দ্রুত কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করতে চায়। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বাউল ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ট্যাঙ্গো ও চ্যামামে নৃত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হবে।
তিনি দুই দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে একটি যৌথ ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ আয়োজনেরও প্রস্তাব দেন।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে বাংলাদেশের নামে একটি সড়ক নামকরণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
এছাড়া দুই দেশের জলবায়ুগত সামঞ্জস্য বিবেচনায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কিছু দেশীয় উদ্ভিদ আর্জেন্টিনায় রোপণ ও স্থানান্তরের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে আর্জেন্টিনা থেকে চারজন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ব্লগারকে বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনার কথাও জানান রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, এসব কনটেন্ট নির্মাতা বাংলাদেশের কোটি আর্জেন্টিনা-সমর্থকের উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা ও ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ ভ্লগ তৈরি করবেন, যা আর্জেন্টিনাসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচার করা হবে।

বৈঠকের শেষে রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বাংলাদেশের জনগণের আন্তরিকতা ও ফুটবলের প্রতি অসাধারণ আবেগের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণে দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উভয় দেশই একযোগে কাজ করবে বলে বৈঠকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version