বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক দেশের লাখো মানুষের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীরা সতর্ক করেছেন। সহজলভ্যতা, সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত পাচার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থার অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ঢাকার এক ইয়াবাসক্ত ব্যক্তি, ছদ্মনাম ‘মেটালফ্রিক’, জানান, ইয়াবা তার স্বাভাবিক জীবন, মানসিক সুস্থতা ও পারিবারিক সম্পর্ক প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। একসময় পোষা পাখির যত্ন নিলেও এখন সেই আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। তার ভাষায়, “এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।”

ইয়াবা সেবনের ফলে দীর্ঘ সময় ঘুমহীন থাকা, মানসিক অস্থিরতা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস, খিঁচুনি, দাঁতের ক্ষয় এবং স্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক আসক্ত শেষ পর্যন্ত মাদকের অর্থ জোগাতে নিজেরাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের মতে, দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে অধিকাংশ আসক্তই যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো চিকিৎসাই পান না।

এদিকে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, মিয়ানমারের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল থেকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত পাচার রোধ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি সংসদে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন অনুমোদন করা হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পুনর্বাসন এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে ইয়াবার বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। সীমান্তে মাদক পাচার রোধ, বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ এবং আসক্তদের পুনর্বাসনে সরকারের আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ইয়াবা আসক্তি আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version