লন্ডনের মানবাধিকারভিত্তিক শীর্ষ আইন সংস্থা Doughty Street Chambers বাংলাদেশের সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ-এর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর প্রসিকিউটরের কাছে একটি আর্টিকেল ১৫ যোগাযোগ (Article 15 Communication) দাখিল করেছে।
এই আবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes Against Humanity) হিসেবে উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর আহ্বান জানানো হয়েছে।

📌 মূল অভিযোগসমূহ

ব্রিটিশ ব্যারিস্টার স্টিভেন পাওলস কেসি (Steven Powles KC) — Doughty Street Chambers-এর সিনিয়র ব্যারিস্টার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ — এই আবেদনটি জমা দেন।

আইসিসিতে জমা দেওয়া আবেদনপত্রে বলা হয়েছে:
• ২০২৪ সালের জুলাই থেকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বা সমর্থকদের ওপর ব্যাপকভাবে হত্যা, অবৈধ আটক, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা চালানো হয়েছে;
• অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত, যাদের অনেকেই জনতার লিঞ্চিং বা প্রহারে প্রাণ হারিয়েছেন;
• অন্তত ১৮ হাজার মানুষকে “অপারেশন ডেভিল হান্ট” অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে;
• ২৫ জন নেতাকর্মী কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন, এবং তাঁদের দেহে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে;
• ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার একতরফা ইমিউনিটি অর্ডার জারি করে, যা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার বা তদন্তের সব সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়।

স্টিভেন পাওলস কেসি বলেন,

“আমরা বিশ্বাস করি, এসব সহিংসতা পরিকল্পিত ও রাষ্ট্র-সমর্থিত। এটি কেবল রাজনৈতিক দমন নয়—এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।”

⚖️ Doughty Street Chambers কারা

১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত লন্ডনভিত্তিক Doughty Street Chambers আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যুদ্ধাপরাধের মামলায় বিশেষভাবে পরিচিত।
এখানে প্রায় ২০০ জন ব্যারিস্টার কাজ করেন, যাদের মধ্যে আছেন এডওয়ার্ড ফিটজগেরাল্ড KC, জিওফরি রবার্টসন KC, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী আমাল ক্লুনি (সাবেক সদস্য)।

এই চেম্বার অতীতে সিয়েরা লিওন, মিয়ানমার ও সিরিয়ার মানবাধিকার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

🤝 ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেন ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি

২০২৫ সালের জুন মাসে লন্ডন সফরের সময় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধ করেছিলেন।
তবে ব্রিটিশ সরকার শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি বাতিল করে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী, সরকার কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে সাক্ষাৎটি স্থগিত রাখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্টারমার প্রশাসন জানত যে আইসিসিতে বাংলাদেশকে ঘিরে একটি অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন, ফলে ব্রিটিশ সরকার সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাথন মার্শাল মন্তব্য করেন,

“ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযোগ থাকায় যুক্তরাজ্য এখন কোনো সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়নি। এটি মূলত কূটনৈতিক সতর্কতা।”

⚠️ যদি অধ্যাপক ইউনূস দোষী সাব্যস্ত হন

আইসিসি তদন্ত শুরু করে যদি অধ্যাপক ইউনূস বা তাঁর প্রশাসনের কেউ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে দোষী প্রমাণিত হন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে পারে।

তারা ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অন্য যে কোনো রোম স্ট্যাটিউট-স্বাক্ষরকারী দেশে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার হতে পারেন।
দোষ প্রমাণিত হলে আদালত আজীবন কারাদণ্ড, সম্পত্তি জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নিষিদ্ধতা জারি করতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় না— আদালত কেবল কারাদণ্ড ও ক্ষতিপূরণ আদেশ দিতে পারে।

🌍 বাংলাদেশের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ ২০১০ সালে রোম স্ট্যাটিউট অনুমোদন করায় দেশটি আইসিসির বিচারিক আওতায় রয়েছে।
যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি, তবে যদি এই আবেদন গৃহীত হয়, এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সরকার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,

“এই অভিযোগ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, মানবাধিকার রেকর্ড এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।”

🔗 সূত্র:
• Doughty Street Chambers Official Communication (London, 2025)
• The Guardian UK
• BBC Monitoring South Asia
• Legal Affairs Weekly

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version