বিএনপি সরকারের সময়ে একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে এবার অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর গ্রাহকরা। জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল হাতে পেয়ে অনেকেই বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। অভিযোগ উঠেছে, স্বাভাবিক বিলের তুলনায় কোথাও দ্বিগুণ, কোথাও আবার আড়াই গুণ পর্যন্ত বেশি বিল আদায় করা হয়েছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, মে মাসের শেষ পাঁচ দিনের ব্যবহার জুন মাসের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের উচ্চ বিলের স্লটে নেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্যও বেড়ে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেকের দাবি, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একই কৌশলে অতিরিক্ত বিল আদায় করা হয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার বাসিন্দা মিঠু ভূঁইয়া জানান, মে মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল ছিল ৬ হাজার ১০০ টাকা। অথচ জুন মাসে সেটি বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ২০০ টাকা, যা প্রায় ৮৭ শতাংশ বেশি। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে এই অতিরিক্ত বিল তাঁর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে বাবুরাইল এলাকার বাসিন্দা শহীদ উল্লাহ শিমুলের ক্ষেত্রেও। তাঁর বাসায় কোনো এসি নেই। মে মাসে ২ হাজার ৩০০ টাকা বিল এলেও জুনে এসেছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বিল বেড়েছে ১২৫ শতাংশ।

আরেক গ্রাহক আরিফ ইশতিয়াক আদনান জানান, তাঁর ভাড়াটিয়ার মাত্র দুটি ফ্যান, একটি ফ্রিজ ও কয়েকটি বাতি রয়েছে। মে মাসে ৮০০ টাকা বিল এলেও জুনে এসেছে ১ হাজার ৭০০ টাকা। অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

পাইকপাড়ার ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁর মাসিক বিল সাধারণত আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও জুন মাসে বিল এসেছে ৬ হাজার ৮৭০ টাকা। এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তাঁকে হতবাক করেছে।

শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক গ্রাহকরাও একই সংকটে পড়েছেন। বালুর মাঠ এলাকার সিন্যামন রেস্টুরেন্টের মালিক শাকিল সারোয়ার জানান, মে মাসে তাঁর রেস্টুরেন্টের বিদ্যুৎ বিল ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। জুন মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭০০ টাকা, যা তাঁর মতে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।

গ্রাহকদের প্রশ্ন, জুন মাসে লোডশেডিং ছিল আগের মাসের তুলনায় বেশি। বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকার পরও কীভাবে বিল এত বেশি এলো? অনেকেই এর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করেছেন।

এদিকে চলতি বছরের ১ জুন থেকে গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক গ্রাহকের বিল ৪৫ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।

অতিরিক্ত বিল ও প্রি-পেইড মিটারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত নাগরিক অধিকার ফোরাম-এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল অভিযোগ করেন, মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলে বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

এদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জজুড়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিরোধী দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন অভিযোগ করছে, বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি ও সেবাখাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version