দীর্ঘ সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লি সফরে যাচ্ছেন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতেই তাঁর এই সফর। আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের ঘোষণা এখনো আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

এবার শি জিনপিং প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি বড় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে পারেন। ২০১৯ সালে সর্বশেষ ভারত সফরের সময় তাঁর সঙ্গে প্রায় ২০০ সদস্যের প্রতিনিধিদল ছিল। ফলে এবার দ্বিগুণ আকারের বহর নিয়ে তাঁর সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

শি জিনপিংয়ের সফরের মূল উদ্দেশ্য ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া হলেও, সম্মেলনের বাইরে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে সম্পর্ককে আরও স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এ সফর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শি জিনপিংয়ের সফরকে সামনে রেখে চীনা কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে দিল্লিতে হোটেল নির্বাচন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তাঁর পূর্ণাঙ্গ সফরসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে কি না, সে বিষয়েও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের বড় একটি অংশ এখনো অচিহ্নিত ও বিরোধপূর্ণ। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করে।

পরবর্তীতে কয়েক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেনা প্রত্যাহারসংক্রান্ত একটি সমঝোতার পর সীমান্ত পরিস্থিতিতে কিছুটা অগ্রগতি দেখা দেয়। তবে সীমান্ত বিরোধ পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়েও সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের খবর এসেছে। গত ১২ আগস্ট ভারত জানিয়েছিল, জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় ভারত ও চীনের টহল দলের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ভারত-চীন কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার হয়েছে। সীমান্ত ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সোমবার বেইজিং সফর শুরু করেছেন। সেখানে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।

ডোভালের বেইজিং সফর এবং এর পরপরই শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দিল্লি সফর- দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেইজিং ব্রিকস সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি ভারত সম্মেলন সফলভাবে আয়োজন করলে চীন তা সমর্থন করবে বলেও জানিয়েছে দেশটি। তবে শি জিনপিংয়ের ভারত সফর নিয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ মুহূর্তে তাদের কাছে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘ সাত বছর পর চীন সফর করেছিলেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কিছুটা বাড়লেও সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কৌশলগত বিভিন্ন ইস্যুতেও ভারত ও চীনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

ব্রিকস সম্মেলনকে দুই দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হলে সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও শুল্কসংক্রান্ত অবস্থানের কারণে ভারত ও চীনের কিছু অভিন্ন স্বার্থও তৈরি হয়েছে। ফলে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দিল্লি সফর শুধু ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version