ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির আবির্ভাব ঘটেছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অর্জন একজন খেলোয়াড়কে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি যেন আবারও প্রমাণ করলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা; প্রতিভা, নেতৃত্ব এবং অসাধারণ ধারাবাহিকতাই একজন মহাতারকাকে কিংবদন্তির আসনে বসায়।

৩৯ বছর বয়সে নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা তাকে ‘সর্বকালের সেরা’র খ্যাতিতে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। গ্রুপ পর্ব শেষেই তার ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬-এ, যা এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দলের মোট গোলসংখ্যার সমান বা তার চেয়েও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে বদলি নেমে অসাধারণ এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে তিনি নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান ৬-এ। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ৬ গোল একাই করেছেন মেসি, যেখানে অনেক দল সম্মিলিতভাবেও এত গোল করতে পারেনি।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেন, ক্রোয়েশিয়া, মিশর ও আলজেরিয়ার মতো দল করেছে ৫টি করে গোল। পর্তুগাল ও কলম্বিয়ার মতো শক্তিশালী দল থেমে গেছে ৪ গোলেই। উরুগুয়ে, ইরান ও জর্ডান করেছে মাত্র ৩ গোল। অন্যদিকে পানামা পুরো গ্রুপ পর্বে একটি গোলও করতে পারেনি। অর্থাৎ, এককভাবে মেসির গোলসংখ্যাই বিশ্বের বহু জাতীয় দলের সম্মিলিত আক্রমণভাগকে ছাড়িয়ে গেছে।

তবে শুধু চলতি আসরের পারফরম্যান্সই নয়, মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসেও গড়েছেন নতুন এক স্বর্ণ অধ্যায়। গ্রুপ পর্ব শেষে তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ, যা ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মাধ্যমে তিনি ভেঙে দিয়েছেন জার্মান কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও এখন মেসির দখলে।

ক্যারিয়ারের প্রায় সব বড় ট্রফি জয়ের পরও মেসির ক্ষুধা যেন ফুরোয়নি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ শিরোপা কিংবা ব্যক্তিগত পুরস্কার সবকিছু জয়ের পরও তিনি মাঠে নামছেন আগের মতোই নিবেদিত একজন যোদ্ধা হয়ে। আর সেই কারণেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন তারকা নন, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষে পরিসংখ্যান বলছে, মেসির ৬ গোলের সমান বা কম গোল করেছে ৩০টি দল। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও এই অর্জনের গুরুত্ব আরও বড়। কারণ, ৩৯ বছর বয়সে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এমন আধিপত্য দেখানো কেবল অসাধারণ নয়, প্রায় অবিশ্বাস্য।

ফুটবলে ‘সর্বকালের সেরা’ নিয়ে বিতর্ক মেসি থামিয়েছেন। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে, দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এবং পুরো বিশ্বের নজর কাড়তে কাড়তে লিওনেল মেসি আবারও মনে করিয়ে দিলেন- মহানদের তালিকায় নয়, তিনি এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় নিজের নাম লেখানোর পথেই হাঁটছেন। আর তাই অনেকের চোখে, তিনি শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন, ফুটবল ইতিহাসেরই সর্বকালের সেরা এক শিল্পী।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version