বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের Berkeley- দীর্ঘ গবেষণা, উদ্ভাবন ও অধ্যবসায়ের পথ পেরিয়ে সাইফ সালাউদ্দিন এখন বিশ্ব প্রযুক্তির আলোচনায়। তাঁর গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Sonera Magnetics-কে ২০২৬ সালে অধিগ্রহণ করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট Apple। বাংলাদেশি এই প্রকৌশলী ও গবেষকের সাফল্য তাই নিঃসন্দেহে দেশের জন্য এক গর্বের অধ্যায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়- বুয়েটের Electrical and Electronic Engineering বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাইফ সালাউদ্দিন। ২০০৩ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৭ সালে Purdue University থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ২০০৮ সালে যোগ দেন University of California, Berkeley-তে। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির TSMC Distinguished Professor of Electrical Engineering and Computer Sciences।

তবে সাইফ সালাউদ্দিনের সাফল্যের গল্প শুধু একাডেমিক অর্জনে থেমে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বছরের পর বছর পরিচালিত গবেষণাকে বাস্তব প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Apple-এর দোরগোড়ায়।

চৌম্বকীয় প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইস নিয়ে সাইফ সালাউদ্দিনের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ম্যাগনেটিক সেন্সর প্রযুক্তি। ক্ষীণ চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার এই প্রযুক্তিকে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করতে তাঁর সঙ্গে কাজ করেন গবেষক ডমিনিক লাবানোস্কি ও নিশিতা ডেকা।

২০১৮ সালে তিনজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন Sonera Magnetics। প্রতিষ্ঠানটি এমন ম্যাগনেটোমিটার প্রযুক্তি উন্নয়ন করতে থাকে, যা কক্ষ তাপমাত্রায় তুলনামূলক ছোট ও বহনযোগ্য ডিভাইসের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্ম চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে।

এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাও ব্যাপক। মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন ক্ষীণ চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে neural sensing, brain-computer interface, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও wearable device-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হতে পারে।

Sonera-র প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগের মধ্যে পেশির কার্যকলাপ শনাক্ত করার সেন্সরও রয়েছে। ফলে চিকিৎসা প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মানব-মেশিন যোগাযোগ- বহু ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এই প্রযুক্তি।

সাইফ সালাউদ্দিনের এই অসাধারণ যাত্রার শিকড় বাংলাদেশেই। বুয়েটে পড়ার সময় তিনি IEEE BUET Student Branch-এর চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এরপর Purdue University-তে পিএইচডি এবং Berkeley-তে গবেষণা ও শিক্ষকতার মাধ্যমে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেন।

আজ তিনি শুধু Berkeley-এর একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক নন; পরবর্তী প্রজন্মের ইলেকট্রনিকস, স্পিনট্রনিকস ও শক্তি-সাশ্রয়ী কম্পিউটিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

সাইফ সালাউদ্দিনের গল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের জন্যও একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা।

বুয়েটের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া যে শিক্ষাযাত্রা পৌঁছেছে Berkeley-এর গবেষণাগারে, সেই গবেষণা থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান; আর সেই প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিয়েছে Apple-এর মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টের অধিগ্রহণে।

বুয়েট থেকে Berkeley, Berkeley থেকে Sonera- আর Sonera থেকে Apple। এই দীর্ঘ পথচলায় সাইফ সালাউদ্দিন শুধু নিজের সাফল্যের গল্প লিখেননি; বিশ্ব প্রযুক্তির মঞ্চে বাংলাদেশের নামও নতুন করে তুলে ধরেছেন।

সাইফ সালাউদ্দিন তাই আজ শুধু একজন সফল প্রকৌশলী ও গবেষক নন- তিনি বাংলাদেশের গর্ব।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version