নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গত ১২ দিনে একের পর এক গুলির ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ৬ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আটজনকে গুলি করে আহত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় থানায় মামলা ও অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত কোনো অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আলাইয়ারপুর, গোপালপুর এবং চৌমুহনী পৌর এলাকার হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে এসব গুলির ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পর অপরাধীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সর্বশেষ সোমবার রাত পৌনে ১২টার দিকে আলাইয়ারপুর ইউনিয়নের মোশাকপুর গ্রামের রমনিরহাট এলাকায় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে পাঁচজনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। এতে নজরুল ইসলাম শান্ত, মারুফ আহমেদ, জসিম উদ্দিন, সাকিব হোসেন ও মো. বাবলু আহত হন। গুরুতর আহত বাবলুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আহত নজরুল ইসলাম জানান, তারা একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। রাতে তিনটি মোটরসাইকেল ও দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় পেছন থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা পাঁচজনই ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁদের মাথা, হাত ও পিঠে গুলি লাগে।

এর আগে ১২ আগস্ট রাত ৯টার দিকে আলাইয়ারপুর ইউনিয়নের উত্তর বর্দি গ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রাব্বি হোসেন রাকিবকে তুলে নিয়ে পায়ে গুলি করার অভিযোগ ওঠে।

৯ আগস্ট সন্ধ্যায় গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের চৌকিদার বাড়িতে ঢুকে ওয়ার্ড যুবদল নেতা সোহাগ হোসেন সোহেলকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি এবং হামলাকারীদের শনাক্তও করা সম্ভব হয়নি।

৬ আগস্ট মধ্যরাতে চৌমুহনী পৌর হকার্স মার্কেটে জেলা বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হাজী আবুল কাশেমকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। তবে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাঁর সহযোগী ও ফার্মেসি ব্যবসায়ী ইয়াসিন সেন্টুর পেটের বাম পাশে বিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় আবুল কাশেম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। কিন্তু মামলার পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

একটি এলাকায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক গুলির ঘটনা ঘটলেও যদি অপরাধীরা বারবার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর এবং সরকার পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা রয়েছে- সেটিও আলোচনায় এসেছে।

বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ৯ আগস্টের গুলির ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর ৬ আগস্টের ঘটনায় বিএনপি নেতা আবুল কাশেম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ওই মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) এ এন এম ইমরান খান বলেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। ঘটনার পর আসামিরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযানও চলছে।

শুধু মামলা দায়ের করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে বেগমগঞ্জে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version