প্রতি পদের বিপরীতে ১,৪৩০ প্রার্থী, বিসিএসের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি আবেদন

দেশের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সংকট কতটা গভীর হয়েছে, তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া। মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজার চাকরিপ্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করছেন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন।

সমাজসেবা অধিদপ্তর গত মে মাসে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২ ক্যাটাগরিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ১ হাজার ৪৮৫টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। গত ২ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পদভেদে আবেদন ফি ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

এত বিপুলসংখ্যক আবেদন পড়ায় পরীক্ষা আয়োজন নিয়েই এখন বিপাকে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস হতে চললেও এখনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার উপায় নির্ধারণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগে জমা পড়া আবেদন সংখ্যা সাম্প্রতিক পাঁচটি সাধারণ বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটির চেয়ে অনেক বেশি।

৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থী। ৪৯তম বিসিএসে আবেদন ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার। ৪৭তম, ৪৬তম ও ৪৫তম বিসিএসে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৩ লাখ ৩৭ হাজার ও ৩ লাখ ৪৬ হাজার।

অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ২১ লাখের বেশি।

এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই অধিদপ্তরের। ফলে পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিদর্শক নিয়োগ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ।

প্রাথমিক বাছাইয়ের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কতজনকে রাখা হবে, তা নিয়েও জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহারিক এবং মৌখিক পরীক্ষা থাকবে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত নিয়োগ শেষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন পাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

অফিস সহায়ক পদেই ৪৭৮টি নিয়োগ

১ হাজার ৪৮৫টি পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদ-৪৭৮টি। এ পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে এসএসসি।

এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১২ জন সমাজকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন ও যাচাই।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক, প্রধান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর, সুপারভাইজার ও কারিগরি প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন পদ রয়েছে।

বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার কারণে সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করপোরেট খাতের সম্প্রসারণ থমকে যাওয়ায় সরকারি চাকরির ওপর চাপ বাড়ছে। বিনিয়োগ সংকোচন ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

বেসরকারি খাতের দুর্বলতার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা এখনো ৫ শতাংশের নিচে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, আগের দুই বছরে তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বিডিজবসের তথ্যেও বেসরকারি নিয়োগের দুর্বলতা দেখা গেছে।

একদিকে চাকরির সুযোগ সীমিত হচ্ছে, অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সরকারি চাকরির প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগিতা পৌঁছে যাচ্ছে নজিরবিহীন মাত্রায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version