দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। খেলাপি ঋণ কম দেখাতে এবং ঋণগ্রহীতাদের স্বস্তি দিতে গত বছর প্রায় ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায়, যা এক বছর আগে ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা হয়েছিল ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এ পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা প্রায় এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত বছরগুলোতে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়। বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষমতা সরাসরি ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার পর পুনঃতফসিলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশের মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ৫৭ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের হাতে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পুনঃতফসিল সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতির আওতায় মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়েই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ সুবিধার আওতায় এখন পর্যন্ত ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি বড় অংশ আবারও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে পুনঃতফসিলকৃত মোট ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা পুনরায় খেলাপি হয়েছে, যা মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ শিল্প খাতে, যার পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত (১৭.৫৬ শতাংশ), চলতি মূলধন (১৩.০৫ শতাংশ), আমদানি (১০.১৯ শতাংশ), বাণিজ্যিক ঋণ (৯.৯৬ শতাংশ), নির্মাণ খাত (৬.৪৮ শতাংশ) এবং কৃষি খাত (৩.০১ শতাংশ)।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পুনঃতফসিলকৃত ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা এবং অবলোপন করা ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা যোগ করলে মোট ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।


