ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিকতার বার্তায়ও আলোচনায় এসেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সম্মেলনের ফাঁকে হিন্দু ধর্মগুরু জগদ্গুরু সতীশাচার্যের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কথোপকথনের একপর্যায়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ঝুঁকে ধর্মগুরুর পা স্পর্শ করে আশীর্বাদ গ্রহণ করছেন।

এই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই পেজেশকিয়ানের এই আচরণকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত বিশেষ সংলাপ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী অংশ নেন। সেখানে জগদ্গুরু সতীশাচার্যের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ধর্ম সংসদের সভাপতি মহামণ্ডলেশ্বর গোস্বামী সুশীলজি মহারাজ এবং পতঞ্জলি যোগপীঠের আচার্য বালকৃষ্ণ।

অনুষ্ঠানে ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, মানবতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি নিয়ে আলোচনা হয়। জগদ্গুরু সতীশাচার্য তাঁর বক্তব্যে সনাতন ধর্মের মানবিক দর্শন তুলে ধরে বলেন, সনাতন ধর্ম সমগ্র বিশ্বকে মানবতার বার্তা দেয় এবং সকল মানুষকে একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখতে শেখায়।

তিনি ‘প্রাণীদের মধ্যে সদ্ভাবনা’র আদর্শের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল- ধর্মের উদ্দেশ্য কেবল কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের জয়ধ্বনি নয়; বরং সকল প্রাণীর মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ধর্মের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজের মত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধর্ম ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবতার সুরক্ষা এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে ধর্মকে মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে যুক্ত করার দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে। ফলে এই সংলাপ কেবল ধর্মীয় আলোচনা হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও গুরুত্ব পেয়েছে।

ধর্মীয় সংলাপের পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকেও অংশ নেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আবু ধাবির যুবরাজ খালিদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ।

ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা এবং তার সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাবের বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চের ফাঁকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক পারস্পরিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইরানি দূতাবাসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তাতেও দুই নেতার সাক্ষাতের বিষয়টি জানানো হয়েছে।

ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে মাসুদ পেজেশকিয়ানের কর্মকাণ্ডে একদিকে যেমন ধর্মীয় শ্রদ্ধা, মানবতা ও সম্প্রীতির বার্তা সামনে এসেছে, অন্যদিকে আবু ধাবির যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিফলিত হয়েছে আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্ব।

হিন্দু ধর্মগুরুর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ গ্রহণের ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, এর পাশাপাশি ধর্মীয় সংলাপে মানবতা ও ন্যায়ের ওপর জোর দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়গুলোও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version