আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের ঘোষণা, গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে রাজনৈতিক বর্জন, প্রতিহিংসা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন বর্তমান তারেক রহমান সরকার রেও দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি দ্য সানডে গার্ডিয়ানকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুখ বদলেছে, কিন্তু দিক বদলায়নি।’
সাক্ষাৎকারে তিনি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে নতুন করে সংগঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থনীতি, মানবাধিকার এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তাঁর অভিযোগ, দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, আত্মগোপনে বাধ্য হওয়া এবং রাজনৈতিক চাপ এখনো অব্যাহত রয়েছে। দলের বহু নেতা-কর্মী কারাগারে, অনেকে আত্মগোপনে এবং অনেকে বাড়িঘর, চাকরি ও ব্যবসা হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও চাপ ও হুমকির মুখে রয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
সংখ্যালঘু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের সংকট কেবল ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে শেষ হবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাস।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; এটি দায়িত্বের বিষয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এরপর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সেবা করা।
শেখ হাসিনার ভাষায়, ‘এমন সময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, প্রশ্ন তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়; বরং বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে কী ঘটছে, সেটিই মূল বিষয়।
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, শিল্প খাত, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, প্রবৃদ্ধি কমেছে, শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি। পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছেন। সরকারের ঋণনির্ভরতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নিজ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ তালিকাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, বন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে তিনি তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বাড়া এবং দারিদ্র্য কমার দাবিও তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনার বক্তব্য, ‘ইতিহাস আমার সময়কে প্রচারণা দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে বিচার করবে।’
তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রচারণা সাময়িকভাবে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা বিচার হবে উন্নয়ন, অর্থনীতি, জনসেবা ও মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তিতে।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দলের প্রথম কাজ হবে ‘রাজনৈতিক নবায়ন’। প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে ভোটাধিকার, নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশাবাদ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের শক্তির মূল উৎস গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, শ্রমিক, কৃষক, নারী, তরুণ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ। তাই দলকে ‘মাটি থেকে ওপরে’ পুনর্গঠনের ওপর জোর এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে তরুণ, নারী, পেশাজীবী, প্রযুক্তিবিদ ও তৃণমূলের সংগঠকদের সামনে আনার কথাও বলেন তিনি।
তবে দলের আদর্শগত অবস্থানে পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন নেই জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবেই থাকবে।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাগুলোর একটি আসে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে।
শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাঁর যুক্তি, দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সীমান্ত, অভিন্ন নদী, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক দুই দেশকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
‘ভারতের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়গুলো উল্লেখ করেন।’
তবে ভারতকেন্দ্রিক কোনো পররাষ্ট্রনীতি নয়- বরং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন শেখ হাসিনা। চীন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেন তিনি।
তাঁর মতে, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ যেন কোনো দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের ঘাঁটিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।’
শেখ হাসিনার মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, স্বচ্ছ পররাষ্ট্রনীতি এবং দায়িত্বশীল আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশই ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো প্রতিবেশী হতে পারে।


