তিন বাসের দুটি ভেসে গেল বন্যার স্রোতে, কাদা-পাথরের পাহাড় পেরিয়ে হেলিকপ্টারে উদ্ধার

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েও অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন ভারতের তামিলনাড়ুর ২১ তীর্থযাত্রী। তাদের বহনকারী তিনটি বাসের মধ্যে দুটি বন্যার প্রবল স্রোতে ভেসে গেলেও কাদা-পাথরের পাহাড় বেয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছান তারা। এ সময় আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে এক নারীর শাড়িই হয়ে ওঠে জীবন বাঁচানোর দড়ি।

তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের ভেলাচেরির বাসিন্দা নাভু কবিরদাস ও তার স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী বলেন, ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার পর তাদের মনে হচ্ছে তারা যেন ‘নতুন জীবন’ ফিরে পেয়েছেন।

তিনটি বাসে মোট ৫৭ জনের একটি তীর্থযাত্রী দল নেপালের রাসুয়া জেলা হয়ে তিব্বত সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় বাসটি কাদায় আটকে যাওয়ায় সেটি মেরামতের জন্য কয়েক মিনিট থামানো হয়। পরে জানা যায়, ওই সামান্য বিরতিই হয়তো তাদের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কবিরদাস জানান, হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনতে পান তারা। মুহূর্তের মধ্যেই পাহাড় থেকে বড় বড় পাথর গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে বন্যার পানি ও কাদার স্রোত।

ভুবনেশ্বরী বলেন, চোখের সামনে তাদের পেছনের একটি বাস কাত হয়ে কাদার মধ্যে ডুবে যেতে দেখেন তিনি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে নেপালি চালক দ্রুত সবাইকে বাস থেকে নেমে পাহাড়ের উঁচু অংশের দিকে দৌড়ানোর নির্দেশ দেন। প্রাণ বাঁচাতে যাত্রীরাও বাস ছেড়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে যান।

বেঁচে যাওয়া ২১ তীর্থযাত্রীর অধিকাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি। প্রবল বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া কাদা ও মাটির প্রায় একতলা সমান উঁচু ঢাল বেয়ে তাদের ওপরে উঠতে হচ্ছিল। কয়েক ফুট উঠেই অনেকে আবার পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন।

এ সময় দলের এক নারী, পুঙ্গোদি, কোনোভাবে পাহাড়ের ওপর উঠে নিজের শাড়ি খুলে নিচে আটকে থাকা যাত্রীদের দিকে ঝুলিয়ে দেন। শাড়ির আঁচল ও পাশে থাকা একটি লোহার তার শক্ত করে ধরে একে একে অন্যরা ওপরে উঠতে থাকেন।

ভুবনেশ্বরী জানান, শেষদিকে এক নারী কিছুতেই পাহাড়ে উঠতে পারছিলেন না। তখন তার কোমরে শাড়িটি শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। ওপরে থাকা সবাই মিলে শাড়ি ধরে টান দিয়ে তাকে নিরাপদ স্থানে তুলে আনেন।

কাঞ্চিপুরম জেলার একটি পঞ্চায়েত ইউনিয়ন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাথ্য জানান, সকালে চীনের ইমিগ্রেশনের উদ্দেশে সিয়াব্রুবেসি থেকে রওনা দিয়েছিলেন তারা। হঠাৎ আকাশে ধুলার বিশাল মেঘ দেখতে পান।

তার ভাষায়, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু কাদা ও পাথরের বিশাল ঢেউয়ের মতো স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। এমন দৃশ্য তারা আগে শুধু সিনেমাতেই দেখেছেন।

কাদায় গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার আগেই কোনোভাবে বাসের চালকের কেবিনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন যাত্রীরা। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার কোনো নির্দিষ্ট পথ ছিল না। চার ফুট ওপরে উঠলেও পা পিছলে পাঁচ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছিলেন তারা।

শেষ পর্যন্ত তারা একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে পানি ও বিস্কুট দেওয়া হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের ছবি পাঠিয়ে বেঁচে থাকার খবরও জানান তারা।

উদ্ধারের পথে তারা কাদার নিচে আটকে থাকা এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্য হাত নাড়তে দেখেন। পরে উদ্ধারকারীদের বিষয়টি জানালে তাকেও উদ্ধার করা হয়।

পরদিন কাঁটাঝোপ ও দুর্গম সরু পাহাড়ি পথ দিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা হেঁটে একটি হেলিকপ্টার উদ্ধারকেন্দ্রে পৌঁছান তীর্থযাত্রীরা। কবিরদাস জানান, পথটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। সামান্য ভুল পদক্ষেপেই প্রায় ৫০ ফুট নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

একপর্যায়ে তারা ভুল পথে চলে গেলেও এক নেপালি পথপ্রদর্শক সঠিক পথ দেখিয়ে তাদের উদ্ধারকেন্দ্রে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। পরে নেপালি সামরিক হেলিকপ্টারে করে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লি হয়ে শেষ পর্যন্ত চেন্নাইয়ে ফেরেন তারা। ভয়াবহ ঘটনায় অনেকের পাসপোর্ট ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হারিয়ে গেছে।

ত্রিচি থেকে ফিরে আসা শিবরঞ্জনী জানান, পাহাড়ি রাস্তার একটি ত্রিকোণাকার অংশে অবস্থান করায় তাদের বাসটি সরাসরি কাদার স্রোতের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। কাদার পাহাড় সামনে থাকা একটি পাথরে আঘাত করে দিক পরিবর্তন করায় বাসটি বেঁচে যায়।

তবে এই ভয়াবহ দুর্যোগে এখনও উদ্বেগ কাটেনি। ৫৭ জনের ওই দলের বাকি ৩৬ জনের সঙ্গে শনিবার পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া বন্যা আঘাত হানার ঠিক আগে চীনের তিব্বতের গিরিয়ং পোর্ট ইমিগ্রেশন ভবনের ভেতরে থাকা চেন্নাইয়ের আরও একটি দলের ৪৯ তীর্থযাত্রীরও এখনো সন্ধান মেলেনি।

তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটি থেকে চার শতাধিক মানুষ নেপালে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ জনের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রাণে বেঁচে ফেরা এক তীর্থযাত্রী নেপাল সরকার, নেপালি সেনাবাহিনী, ভারতীয় দূতাবাস ও তামিলনাড়ু সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি সত্যিই এক অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য যাত্রা ছিল।’

ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস, কাদা ও পাথরের স্রোতের মধ্যেও শাড়িকে দড়ি বানিয়ে একে অপরকে টেনে পাহাড়ে তুলে বাঁচার এই ঘটনা এখন সেই ২১ তীর্থযাত্রীর কাছে মৃত্যুকে হার মানানোর এক অবিশ্বাস্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version