তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে দেশের বিদ্যুৎ সংকট। কোনো নির্দিষ্ট শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কোথাও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, গতকাল রোববার দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ রেকর্ড ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টায় জাতীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫১ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং করা হয় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এর আগে গত ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট এখন শুধু সাময়িক ভোগান্তির পর্যায়ে নেই; বরং তা জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

চলমান গ্যাস সংকটই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আগে প্রতিদিন প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুটে।

ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আগে গ্যাস থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বর্তমানে গড়ে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকার সমস্যা। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখান থেকে বর্তমানে মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ভারত থেকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহও কমেছে বলে।

বিদ্যুৎ সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলো সামনে এলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন উঠছে।

কারণ, একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছানো- যেখানে রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিং করতে হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও মানুষ দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না- তা কেবল উৎপাদন ঘাটতির হিসাব দিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়। এখন প্রশ্ন উঠছে- আগাম সংকটের পূর্বাভাস থাকার পরও কেন পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা হলো না?

বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির। মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। বর্তমানে সেখান থেকে প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ২১২ কোটিতে নেমে যায়। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট হলেও দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অনেক কম।

ফলে গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি আঘাত করছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। রাজশাহীর বাঘার সাত ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে সেচ, কৃষিকাজ, ব্যবসা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।

যশোরের অভয়নগরে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নওয়াপাড়ার বুইকরা গ্রামের একটি খামারে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চার শতাধিক মুরগি মারা যাওয়ার অভিযোগ করেছেন খামারি।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে ১৫০ টাকার এক ক্যান বরফ ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বরফের অভাবে শত শত মাছধরা ট্রলার ঘাটে আটকে থাকায় ইলিশ মৌসুমেও জেলেদের সাগরে যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রামে নির্দিষ্ট শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও গৃহস্থালি কার্যক্রম।

রংপুরে ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে হাসপাতাল-ক্লিনিকের সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ছোট শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গরমে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগও বাড়ছে।

সিলেটেও জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শনিবার ২২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৮১ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; দেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, হাসপাতাল, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন- সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময়ের অনিয়মিত লোডশেডিং শুধু মানুষের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, উৎপাদন ব্যাহত করে বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকিও।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না?

সরকারের কাছে এখন জনগণের প্রত্যাশা, সংকটের প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা, কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বন্ধ বা কম উৎপাদন করছে তার হিসাব দেওয়া এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ব্যর্থতা থাকলে তার দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি।

রেকর্ড লোডশেডিংয়ের এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে- বিদ্যুৎ সংকট আর শুধু ‘লোডশেডিং’ নয়; এটি এখন জনজীবন, উৎপাদন ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের জাতীয় সংকেত।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version