চিকিৎসা নিতে গিয়ে সুস্থ হয়ে ফেরার বদলে অনেক রোগীকেই ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে। কোথাও ভুল রক্ত সঞ্চালন, কোথাও অ্যানেসথেসিয়ার ভুল মাত্রা, আবার কোথাও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ বা স্যালাইন না দেওয়ার অভিযোগে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বগুড়া শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ন্যূনতম মানদণ্ড, প্রয়োজনীয় জনবল এবং কার্যকর তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম, বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন না করা, নামি চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগী আকর্ষণ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও নার্স ছাড়াই অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬টি। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা ৭০০-এরও বেশি বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন লাইসেন্স নবায়ন করেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানেও বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলেও পরে নাম পরিবর্তন বা স্থান বদল করে আবার ব্যবসা শুরু করছে।

সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ভুল রক্ত প্রয়োগের অভিযোগে প্রসূতি আফরিন জাহান অহনা, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে শিশু আব্দুল্লাহ আল আয়ান, টনসিল অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়ার ভুল প্রয়োগে শাপলা বেগম, ভুল চিকিৎসার অভিযোগে অন্তঃসত্ত্বা জবা বালা রানী, প্রসূতি রোখসানা আক্তার ও তাঁর গর্ভের সন্তান এবং উজ্জ্বল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, একই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম একসঙ্গে বহু ক্লিনিক ও হাসপাতালের সাইনবোর্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন চিকিৎসকও অভিযোগ করেছেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়াই নাম ব্যবহার করে রোগী টানছে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান। এতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকদের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১০ শয্যার একটি ক্লিনিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক এমবিবিএস চিকিৎসক, নিবন্ধিত নার্স, সার্জন, গাইনি বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেসথেটিস্ট থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেই নিয়ম মানছে না। কোথাও পর্যাপ্ত নার্স নেই, কোথাও ডিউটি চিকিৎসক ছাড়াই রোগী ভর্তি করা হচ্ছে, আবার কোথাও জরুরি চিকিৎসার ন্যূনতম প্রস্তুতিও নেই।

পরিবেশগত দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জেলার অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে চরম অব্যবস্থা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চিকিৎসা এখন অনেক ক্ষেত্রে সেবার বদলে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। জীবন বাঁচানোর আশায় হাসপাতালে গিয়ে অনেক পরিবার হারাচ্ছে তাদের স্বজনকে। অথচ এসব অভিযোগ ও মৃত্যুর ঘটনার পরও কার্যকর নজরদারি, কঠোর ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, লাইসেন্স যাচাই, চিকিৎসার মান নিশ্চিতকরণ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আরও বাড়তে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষা করে নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version