হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত, ইউরিয়া-ফসফেটের দাম ঊর্ধ্বমুখী; কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে তৈরী হয়েছে উদ্বেগ।

বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হানছে কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায়। পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সার সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে ইউরিয়া ও ফসফেট সারের বৈশ্বিক বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা, বেড়েছে দাম, আর একই সঙ্গে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সারবাহী জাহাজের চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক ব্লগে উল্লেখ করা হয়, এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এশিয়া ও আফ্রিকার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কৃষি উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের মোট নাইট্রোজেন সারের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ফসফেট সারের প্রায় ১১ শতাংশ সরবরাহ করে। এই অঞ্চলের সার রপ্তানির প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রণালি দিয়ে বহির্গামী সারের চালান প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং এখনও স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক সারের বাজারে। যুদ্ধ শুরুর পর ইউরিয়া সারের দাম প্রতি টনে প্রায় ৪০০ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমে ৪৫৩ ডলারে এলেও বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। একইভাবে ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের দামও ৫৮০ ডলার থেকে বেড়ে ৭৭০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই মূল্য আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। ভারত তার নাইট্রোজেন সারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে আফ্রিকার মালাউই, মোজাম্বিক, কেনিয়া ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলোর কৃষিও এই অঞ্চলের সার আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে সার সংকট দীর্ঘায়িত হলে এসব দেশে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংকট আরও জটিল করে তুলেছে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি। চীন ও রাশিয়ার মতো বড় উৎপাদনকারী দেশগুলো সারের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বা বিশেষ লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি অচল থাকায় সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে বিকল্প পথে সার পাঠানোর চেষ্টা করছে। তবে এই পথ তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক পরিবেশের ওপরও। জ্বালানি সংকটের কারণে বিকল্প ও দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে জাহাজ চলাচলের সময় ও জ্বালানি খরচ বেড়ে কার্বন নিঃসরণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকরা পর্যাপ্ত সার না পেলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং দারিদ্র্য ও অপুষ্টির ঝুঁকি নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করবে। তাদের ভাষায়, একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অভিঘাত এখন সীমান্ত পেরিয়ে বৈশ্বিক কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version