ডিআইজি আলী আকবরের একক রাজত্ব চলছে সিআইডিতে। হাজার কোটি টাকা ঘুষ ও বিদেশে পাচারের সংবাদ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ১২ মে সিআইডির প্রধান হিসেবে যোগদান করেন অতিরিক্ত আইজি ছিবগাত উল্লাহ। এরপর তিনি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার ব্যাচমেট আলী আকবরকে আরআরএফ ঢাকা থেকে বদলি করে সিআইডিতে নিয়ে আসেন। সম্ভবত এটি ছিল ছিবগাত উল্লাহর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ও বাজে সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ, পরবর্তীতে ছিবগাত উল্লাহর সিআইডি থেকে চলে যাওয়ার পেছনে যিনি কাজ করেছিলেন, তিনি হলেন ডিআইজি আলী আকবর। এটি অবশ্য ছিবগাত উল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু তখন তার কিছু করার ছিল না।

ডিআইজি আলী আকবর চাকরির শুরু থেকে আগাগোড়া একজন দুর্নীতিবাজ, উগ্র মেজাজী ও স্যাডিস্ট কর্মকর্তা। তিনি প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচিত হন চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে সাংবাদিক জহুরুল হককে ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করার মাধ্যমে। তখন আলী আকবর ছিলেন সিএমপির ডিসি (বন্দর)। এই ঘটনার পর তৎকালীন বিএনপি সরকার একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তখন সারাদেশে সাংবাদিকরা তাকে প্রত্যাহার ও শাস্তির আওতায় আনার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি দেন। এরপর তাকে নিয়ে আরও অনেক ঘটনা ঘটে। চাকরি জীবনের কোনো অফিসেই তিনি বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি।

বিতর্কিত কর্মকর্তা বলেই ইন্টেরিম সরকার তাকে আরআরএফ ঢাকায় পোস্টিং দিয়ে রাখে, যাতে তাকে নিয়ে আবার সাংবাদিকরা কোনো কর্মসূচি না দেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অতিরিক্ত আইজি ছিবগাত উল্লাহ তাকে ২০২৫ সালের জুন মাসে সিআইডির বিশেষায়িত ইউনিটে বদলি করে নিয়ে আসেন। কারণ, সিআইডিতে কাজ করার মতো কোন দক্ষতা, যোগ্যতা ও তদন্ত জ্ঞান আলী আকবরের ছিল না।

তাকে তো সিআইডিতে আনা হলোই, তারপর তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মানিলন্ডারিং ইউনিটের মতো একটি বিশেষায়িত জায়গায়। যেটি কোনোভাবেই উচিত হয়নি বলে সিআইডি এবং পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের অনেকে তখন আলোচনা করতেন। আলী আকবর এসে তার সেই আগের স্বভাবজাত ব্যবহার শুরু করলেন এবং একটি সিন্ডিকেট তৈরি করলেন। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হলেন তার ব্যাচমেট একরামুল হাবিব, ইন্সপেক্টর আশরাফ, এসএস আজাদ, এসএস নজরুল এবং আরও কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টর। এই ইন্সপেক্টর আশরাফ হলেন আলী আকবরের বর্তমান ক্যাশিয়ার। বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমে কী হবে আর কী হবে না, তা ঠিক করেন আলী আকবর ও ইন্সপেক্টর আশরাফ।

কে এই আশরাফ?

ডিআইজি মোল্লা নজরুল যখন জয়পুরহাটের এসপি ছিলেন, তখন ইন্সপেক্টর আশরাফ ছিলেন তার সদর থানার ওসি। এরপর মোল্লা নজরুল যখন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ছিলেন, তখন ইন্সপেক্টর আশরাফ ছিলেন টঙ্গী থানার ওসি। এরপর মোহাম্মাদ আলীর সময়ে ২০২৩ সালে ইন্সপেক্টর আশরাফ আবার সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে চলে আসেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে ইন্সপেক্টর আশরাফকে সিআইডি থেকে বদলি হলেও আলী আকবর সেই বদলি বাতিল করে তাকে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে রেখে দেন।

বর্তমানে সিআইডির মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে অনেক প্রশ্ন ও অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিআইডির ডিআইজি আলী আকবর এবং তার নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট মানিলন্ডারিং এর অনুসন্ধান ও মামলার নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের ও লোটপাটের সঙ্গে জড়িত। ২০২৫ সালে আলী আকবর ও একরামুল হাবিব মিলে মালয়েশিয়া মানবপাচার চক্রের একটি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে সিআইডিকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসেন। এ সময় সিআইডিকে নিয়ে অনেক তীব্র সমালোচনা হয়। এখানে তিনি ও তার টিএইচআই টিম ১৫৪ কোটি টাকা আসামিদের কাছ থেকে আদায় করেন বলে জানা যায়। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে।

অপ্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়

রপ্তানিকারকদের অপ্রত্যাবাসিত আয় বাংলাদেশে না নিয়ে আসা সংক্রান্ত ২০২৪ সালে ১৮৩টি মানিলন্ডারিং ইনকোয়ারি চলমান থাকলেও বর্তমানে বেক্সিমকোর ১৭টি মামলা বাদে আলী আকবর সবগুলোতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

নাফিস শরাফতের মামলা

আলী আকবর নাফিস শরাফতের কাছ থেকে শত কোটি টাকা নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হাসান তাহেরের বনানীর বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন।
বর্তমানে আলী আকবর নাফিস শরাফতের মামলা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেন এবং তিনি সিআইডির অভ্যন্তরীণ মিটিংয়েও বিষয়টি আলোচনা করেন। সর্বশেষ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি সেখান থেকেও অনুমতি পাননি। কিন্তু তিনি ইতোমধ্যে এই কাজের জন্য অবৈধ অর্থ নিয়ে নিয়েছেন।

রংধনু গ্রুপ ও ফার ইস্ট ইন্স্যুরেন্স

রংধনু গ্রুপ প্রধানের ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত আলী আকবরের সিআইডি রুমে মিটিং করেছেন (সিআইডির সেন্ট্রাল সিসিটিভি ফুটেজ রক্ষিত আছে)। তিনি নিজেও দেশের বাইরে রফিকের সঙ্গে মিটিং করেছেন। এই গ্রুপের কাছ থেকেও তিনি কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

কিন্তু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মংনেথাই ডিআইজি আলী আকবর কথা মত কাজ না করায় তাকে মামলা থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং মংনেথাইকে সিআইডি নরসিংদীতে গত ৪ জুন ২০২৬ বদলি করা হয়। (বদলি আদেশ সংযুক্ত)

বিএসবি গ্লোবাল

আলোচিত বিএসবি গ্লোবাল মামলায় বাশার গ্রেফতার হলে আলী আকবর ও এসএস আজাদ মিলে তাদের কাছ থেকেও কয়েক কোটি টাকা নিয়েছে। বাশার সিআইডিতে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় বাশারের লোকজনের সাথে আলী আকবর দফায় দফায় মিটিং করত।

জেন ইন্টারন্যাশনাল


হাজার কোটি টাকা মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার-সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধান সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মাদ আলী ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বিএফআইইউ এর অনুরোধে যাচাই-বাছাই কমিটি অনুসন্ধানটি পুনরায় চালু করে।

কিন্তু ডিআইজি আলী আকবর পুনরায় এই অনুসন্ধান ফাইনাল দেওয়ার জন্য তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের চাপ প্রয়োগ করেন। এতে কাজ না হলে আলী আকবর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর কবিরকে (পুলিশ সুপার পদোন্নতিপ্রাপ্ত) সবার সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং হুমকি দেন।

অতি সম্প্রতি এরপর আলী আকবর ইন্সপেক্টর আশরাফকে দিয়ে অনুসন্ধানটি আবার ফাইনাল রিপোর্ট প্রদান করেন এবং ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। আগেরবার এই অনুসন্ধানের ফাইনাল রিপোর্ট নিয়ে প্রথম আলো বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এই অনুসন্ধানের কর্মকর্তা ছিলেন ইন্সপেক্টর আশরাফ।

নোমান গ্রুপ

অতি সম্প্রতি এই অনুসন্ধানটিও ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এখান থেকেও তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

ক্যাডার অফিসার চেয়ে এসআই ও ইন্সপেক্টরদের দৌরাত্ম্য

আলী আকবরের কাছে সবসময় বেশি কদর এসআই ও ইন্সপেক্টরদের। সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের কাছ থেকে অনুসন্ধান ও মামলা সরিয়ে নিয়ে দেওয়া হচ্ছে এসআই ও ইন্সপেক্টরদের কাছে। অথচ এই ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট করা হয়েছিল ক্যাডার অফিসারদের প্রাধান্য দিয়ে।

ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে চলছে এক তুঘলকি কাণ্ড। দেখার কেউ নেই। ডিআইজি আলী আকবরের ইচ্ছায় যা ইচ্ছা তাই হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিভিন্ন ঘটনায় চলমান মানিলন্ডারিং ইনকোয়ারিগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিআইজি আলী আকবর একটি নতুন মডেল দাঁড় করিয়েছেন। এটাকে অনেকে ‘আলী আকবর মডেল’ বলেন। তার সঙ্গে যারা এখন কাজ করছেন, তারা যা জানান তা হলো আসামিপক্ষকে অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য সব সংগ্রহকৃত এভিডেন্স ধ্বংস করে নামকাওয়াস্তে শুধু অনুসন্ধানটি দুদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে অনুসন্ধানটি পরবর্তীতে আর কখনও আলোর মুখ দেখতে না পারে।

বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমে কর্মরত একাধিক তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন। এতে আসামিদের অনেক সুবিধা হচ্ছে এবং বিনিময়ে ডিআইজি আলী আকবর ও তার সিন্ডিকেট পাচ্ছেন অবৈধ অর্থ। ডিরেক্ট অফিসারদের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হচ্ছে এসআই ও ইন্সপেক্টরদের কাছে, যাতে ঘুষখোর আলী আকবর তার ইচ্ছামতো অনুসন্ধান ও তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করতে পারেন। ডিআইজি আলী আকবর ও ইন্সপেক্টর আশরাফের কথায় চলছে বাংলাদেশ পুলিশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।

একই ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ দুই দায়িত্বে

বর্তমানে আলী আকবর ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) হিসেবে দায়িত্বে আছেন এবং তিনি একই সঙ্গে সিআইডির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিষয়টিকে অনেকে সাংঘর্ষিক মনে করছেন। বিশেষ করে বিএফআইইউর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো অনুসন্ধান ও মামলা তদন্তে এই দুই পদের কিছু নির্দিষ্ট রুল রয়েছে। যেখানে পদ দুটিতে সবসময় দুইজন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকার কথা। কিন্তু কোনোভাবেই একজন ব্যক্তি একই সময়ে এই দুই পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা। অবশ্য দেখার কেউ নেই।

আলী আকবরের রহস্যজনক বিদেশ সফর

গত এক বছরে আলী আকবর ১০ বারের অধিক বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং কোন কোন সময়ে এক মাসেরও অধিক সময় বিদেশে অবস্থান করেছেন। তিনি গত এক বছরে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, দুবাই, ইতালি, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। অধিকাংশ সময় তিনি বিদেশে বিভিন্ন আসামির সঙ্গে মিটিং করে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ও তদন্ত আপস-রফা করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে বর্তমানে সিআইডিতে কর্মরত একাধিক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জুনিয়র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ডিআইজি আলী আকবরের অবসরের নাটক

আলী আকবর ৪ জুন ২০২৬ অতিরিক্ত আইজি হতে না পেরে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে অবসরের আবেদনপত্র জমা দেন। সেখানে তিনি যা লিখেছেন, তা কোন সরকারি কর্মকর্তা কোনোভাবেই লিখতে পারেন না। কিন্তু তাকে কেউ থামাতে পারছে না। পদত্যাগের নাটক করে তিনি এখনও সিআইডির প্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন।এ ধরনের নাটকের আসল উদ্দেশ্য বিপজ্জনক। আর নিয়ম অনুযায়ী একবার সরকারী চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পুনরায় সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা আইনবিরুদ্ধ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version