ড. কাজী সাইফুল ইসলামের কলাম

বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে যেসব মানুষের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁদের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ অন্যতম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তাঁদের নাম, নেতৃত্ব, ত্যাগ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তাঁদের অবদান নিয়ে যত আলোচনা, যত গবেষণা, যত বিশ্লেষণই হোক- এই দুই মহান নেতার ভূমিকার গভীরতা অনুধাবনের জন্য তা কখনোই যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, ছাত্র-যুবসমাজের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা মিলেই স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিল। ষাটের দশকে ছাত্রসমাজের মধ্যে গড়ে ওঠা বিভিন্ন গোপন ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংগঠন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ছয় দফার দাবি বাঙালির রাজনৈতিক চেতনাকে নতুন মাত্রা দেয়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো দেয় এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমেই শক্তিশালী করে।

একদিকে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- যাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি রাজনৈতিক মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবতার দিকে এগিয়ে নিয়েছিল। অন্যদিকে ছিলেন একদল সাহসী, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণ- যাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ, জীবন ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধারণ করেছিলেন। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো, বঙ্গবন্ধু যেমন এই সাহসী তরুণদের শক্তি ও নিষ্ঠা পেয়েছিলেন, তেমনি তাঁরাও বঙ্গবন্ধুর মতো একজন দূরদর্শী ও গণমানুষের নেতা পেয়েছিলেন। এই পারস্পরিক আস্থা ও নেতৃত্বের সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসাধারণ গণসম্পৃক্ততা। তাঁর একটি আহ্বান, একটি ভাষণ, এমনকি তাঁর প্রতীকী অঙ্গভঙ্গিও কোটি কোটি মানুষকে আন্দোলিত করতে পারত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ তার অনন্য উদাহরণ। সেই নেতৃত্ব, সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জনগণের প্রতি অসাধারণ আস্থার ফলেই একটি জাতি স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিষয়টিকে যদি বিজ্ঞানের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি, তাহলে বলা যায়- একটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস এবং তাকে ঘিরে ইলেকট্রনের অবস্থান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই যেন বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনের বৃহৎ পরিসরটি আবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই রাজনৈতিক সমীকরণে দ্রুত পরিবর্তন আসে। যে ঐক্য ও পারস্পরিক নির্ভরতা স্বাধীনতার সংগ্রামকে সফল করেছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তার অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানেই ইতিহাসের একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে- স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশের দূরত্ব কেন তৈরি হলো? কেন স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনের কাজে আরও সুসংহত করা গেল না? কেন নবজাতক রাষ্ট্রটি তার সবচেয়ে সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক বিভাজন, সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্যে পড়ে গেল?

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল একেবারেই ভঙ্গুর একটি রাষ্ট্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, অবকাঠামোর ধ্বংস, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা চাপ- সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রটির সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয় সংহতি ছিল সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্রের ভেতরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালীর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়। এটি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ওপর গভীর আঘাত। একটি নবজাতক রাষ্ট্র যখন তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন তার প্রতিষ্ঠাতা নেতার হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রটির বিকাশের গতিপথকেই আমূল পরিবর্তন করে দেয়। সেই অর্থে একে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অকাল রাজনৈতিক মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা যায়।

একটি শিশু জন্মের পর যদি অকালেই মৃত্যুবরণ করে, তার সামনে যেমন সম্ভাবনার অসংখ্য দরজা আর কখনো খুলে যায় না, তেমনি একটি নবীন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা যখন সহিংসতার মাধ্যমে ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তার সম্ভাবনার পথও বাধাগ্রস্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য তেমনই এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের সামনে আশার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি যে অসাধারণ দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সরকার পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং যুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের মতো একজন দূরদর্শী ও দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইতিহাস তাঁকেও বেশি সময় দেয়নি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোদ্ধার এই নির্মম পরিণতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি গভীর ক্ষত তৈরি করে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ- এই দুই নেতার মৃত্যু শুধু দুটি মানুষের মৃত্যু নয়; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং একটি নবীন রাষ্ট্রের সম্ভাবনার ওপর ভয়াবহ আঘাত। তাঁদের হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় জীবনে নানা মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। একটি জাতির স্বপ্নকে হত্যা করা যায়, কিন্তু সেই স্বপ্নকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক দর্শন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে।

আমার বিশ্বাস, আজ থেকে ২০, ৩০ কিংবা ৫০ বছর পর বাংলাদেশের কোনো এক প্রান্তে আবারও কোনো তরুণ বা তরুণী মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা বলবেন। তাঁর কণ্ঠে যদি সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের শক্তি থাকে, তবে হয়তো আবারও একটি জাতি বিভাজন ভুলে বৃহত্তর কল্যাণের লক্ষ্যে এক কাতারে দাঁড়াবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ হয়তো ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে জন্ম নেবেন না। এমন নেতৃত্ব শত শত বছরে একবার আসে। তাই তাঁদের স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় শুধু তাঁদের নিয়ে কথা বলা নয়; বরং তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, গণমুখী, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা।

ইতিহাসের কাছে আমাদের দায় আছে। সেই দায় হলো অতীতকে আবেগ দিয়ে নয়, সত্য ও বিবেক দিয়ে বিচার করা; ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া; রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

বাংলাদেশের জন্ম যে ত্যাগের মধ্য দিয়ে, সেই ত্যাগ যেন কখনো বৃথা না যায়- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

জয় হোক মেহনতি মানুষের।
জয় হোক মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার।

১৫ আগস্ট ২০২৬
ড. কাজী সাইফুল ইসলাম
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version