মৃত্যুর পরও যেন মানুষের কাজে আসে নিজের শরীর- এমন প্রত্যয় থেকেই মরণোত্তর দেহদান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নবীগঞ্জের লিটন দাশ তালুকদার (৩৯)। তার দেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে কোনো মৃত মানুষের দেহ গ্রহণের এটিই প্রথম ঘটনা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে লিটন দাশের মরদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন তার বড় ভাই দিপু দাশ তালুকদার ও স্বজনরা।

লিটন দাশ তালুকদার নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশা এলাকার মৃত দ্বিজেন্দ্র দাশ তালুকদারের ছেলে। তিনি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়।

অসুস্থতার মধ্যেই নিজের মৃত্যুর পর দেহ দানের সিদ্ধান্ত নেন লিটন। পরিবারের সদস্যদেরও তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তার মরদেহ দাহ না করে মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। পরে গত ১৩ আগস্ট হবিগঞ্জের নোটারি কার্যালয়ে মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণাপত্র সম্পাদন করেন। এতে তার ভাই দিপু দাশ তালুকদার ও মা রেখা রাণী দাশ স্বাক্ষর করেন।

রোববার বেলা ১১টার দিকে নিজ বাসভবনে মারা যান লিটন দাশ। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মরদেহ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ কাজে অধ্যক্ষ ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পালসহ সংশ্লিষ্টরা যুক্ত ছিলেন।

মরদেহ হস্তান্তরের আগে জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। লিটন দাশের পরিবার, বাসদ হবিগঞ্জ জেলার সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সবুজ দাশসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

পরে নবীগঞ্জে উপস্থিত হয়ে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের পক্ষে মরদেহ গ্রহণ করেন এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল।

মরদেহ হস্তান্তরের আগে বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে লিটন দাশের কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাকে ‘লাল সালাম’ প্রদান করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লিটন দাশের মরণোত্তর দেহদান হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একজন মানুষ মৃত্যুর পরও তার দেহকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাজে উৎসর্গ করে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত মানবকল্যাণের এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে আসার যে অঙ্গীকার তিনি করে গিয়েছিলেন, নিজের দেহ দানের মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকারই বাস্তবে রূপ দিলেন লিটন দাশ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version