বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচল, স্যাটেলাইট ও ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কৌশলগত এই জলপথে ইরানের আগের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিপরীতে, মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ চলাচলে ওয়াশিংটনের প্রভাবও বাড়ছে।

জাহাজ ট্র্যাকিং ও স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ৮০ শতাংশের বেশি ওমান-নিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবহার করেছে। জাতিসংঘ অনুমোদিত এই রুট ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে ইরান। এমনকি রুটটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নির্দেশ উপেক্ষা করে অধিকাংশ জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা রেখে ওমানের রুট দিয়ে প্রণালি পার হচ্ছে।

কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হুমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ইরান অন্তত আংশিকভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং সময় যত যাচ্ছে বিষয়টি ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কেপলারের তথ্য বলছে, মাত্র এক মাস আগেও ওমানের রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় ছিল। বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ইরানের নির্ধারিত রুটে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় তেহরানের পক্ষে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক আদায়ও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ গত সোমবার শেষ হওয়ার পর তাত্ত্বিকভাবে ইরানের টোল আদায়ের সুযোগ তৈরি হলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর করতে পারছে না দেশটি- এমনটাই মনে করছে কেপলার।

‘পিকারিং এনার্জি পার্টনার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, ইরানের টোল আদায়ের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ পক্ষ মেনে নিতে আগ্রহী নয়। ফলে জাহাজগুলো ওমানের উপকূলসংলগ্ন রুট ব্যবহারকেই তুলনামূলক নিরাপদ ও যৌক্তিক মনে করছে।

‘লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটস’-এর প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো জানান, পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা তেল দ্রুত বাইরে নিয়ে আসতে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার বা ভিএলসিসি ভাড়া করেছে।

এসব ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে যাওয়ার পর অন্য ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধকালীন ঝুঁকি কমিয়ে তেল সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

ইরানের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে অনেক জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডারও বন্ধ রাখছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে এসব জাহাজকে ‘ডার্ক ট্রাফিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন জাহাজ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও প্রচলিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় তাদের গতিবিধি অনুসরণ করা কঠিন।

হরমুজ প্রণালিতে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি থাকায় যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ চলাচলের ওপর তুলনামূলক বেশি নজরদারি করতে পারছে। প্রচলিত বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত তেল পরিবহনের পরিমাণও বেশি।

গত সপ্তাহে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল।

অর্থাৎ তেল পরিবহন অনেকটাই সচল হলেও তা এখনো সংঘাত-পূর্ব পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এদিকে গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তবে তাঁর এই দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা।

কারণ, এর আগেও ট্রাম্প একই ধরনের দাবি করেছিলেন। পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো প্রণালিতে তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও কঠিন।

অন্যদিকে, ইরানও যে আগের মতো এককভাবে প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না, সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য থেকে তার ইঙ্গিত মিলছে। বিপুলসংখ্যক ট্যাংকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী প্রণালি পার হয়ে থাকে, তাহলে তা তেহরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ারই প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে ইরান ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রভাব এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ওমানের বিকল্প রুটে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি এবং তেল পরিবহন সচল রাখার নতুন কৌশল- সব মিলিয়ে কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version