১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের নীরব অবদান, অকথ্য বেদনা ও দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা। তাঁদেরই একজন বুলবুল রানী। রাজশাহীর কুমারপাড়ায় বেড়ে ওঠা এই নারী মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে প্রত্যক্ষ করেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, শহীদদের স্বজনের আহাজারি এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের অসহনীয় যন্ত্রণা। নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ, আহতদের সেবা ও শরণার্থীদের সহায়তায়।
বুলবুল রানীর জন্ম ১৯৫৫ সালের ৯ এপ্রিল। রাজশাহী শহরের কুমারপাড়ায় তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। বাবা ভোলানাথ ঘোষ এবং মা মণিবালা ঘোষের সন্তান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের আগে রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্রী থাকাকালে অসহযোগ আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তাঁকে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে।
১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রখ্যাত আইনজীবী বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও সমাজসেবী সুরেশ পাণ্ডে শহীদ হন। তাঁদের মৃত্যুর পর শৈলজ্য কুটিরে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি হন বুলবুল রানী।
সুরেশ পাণ্ডের নিথর দেহের পাশে তাঁর অশীতিপর বৃদ্ধা মায়ের আক্ষেপ, শোক আর অসহায় কান্না তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। স্বজন হারানোর সেই বেদনা তাঁর মনে মুক্তিযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার এক স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। মানুষের কান্না ও রক্তের স্রোত দেখে তিনি যে মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন, তা পরবর্তী দিনগুলোর প্রতিটি কাজে তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
পাকিস্তানি বাহিনীর তালিকায় বাবা ভোলানাথ ঘোষের নাম থাকায় পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বুলবুল রানী। বাবাকে রক্ষা করতে তাঁরা রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আশ্রয় নেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠলে ১ মে সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মালদহে আত্মগোপন করেন তিনি।
মালদহে গিয়ে তাঁর ভূমিকা কেবল আশ্রয় নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তথ্য সংগ্রহ ও মানবিক সহায়তার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।
মালদহ ডাকবাংলোকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অভিযান ও যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন বুলবুল রানী। এসব তথ্য সংরক্ষণ করে সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও করতেন তিনি।
যুদ্ধের মাঠে অস্ত্র হাতে না থাকলেও তথ্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার এই উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড, অভিযানের খবর এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে তিনি নেপথ্যের এক সাহসী কর্মী হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
মালদহে অবস্থানকালে পোড়াটুলি, ঘোড়াহাটিসহ বিভিন্ন শিবিরে ঘুরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান বুলবুল রানী। তাঁদের জন্য ওষুধ, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতেন। একই সঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে শিশুদের জন্য শিশুখাদ্য সরবরাহের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
যুদ্ধের বিভীষিকায় আহত তরুণদের চিকিৎসা ও সেবায় তাঁর এই অবদান ছিল মানবিক দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজের সামর্থ্য উজাড় করে দেন।
পোড়াটুলি ক্যাম্পে একদিন গুরুতর আহত ও কমবয়সী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সেবা করতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বুলবুল রানী। অতিরিক্ত রক্তপাত, যন্ত্রণাকাতর আহতদের করুণ অবস্থা এবং চারপাশের মর্মস্পর্শী দৃশ্য তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
আহতদের সেবা করতে করতেই একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে মাথায় পানি ঢেলে তাঁকে সুস্থ করে তোলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত বাস্তবতা তাঁর শরীর ও মনে যে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল, এই ঘটনাটি তারই এক বেদনাময় স্মারক।
মালদহে অবস্থানকালে বুলবুল রানী অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। তবে দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ আর হয়নি তাঁর।
প্রশিক্ষণ চলাকালে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তাঁদের প্রশিক্ষণের ছবি তোলেন। সেই সময়ের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা তাঁর জীবনে বিশেষ জায়গা করে আছে। মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে এক মগ চা উপহার দেন। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোর সেই সামান্য উপহারও তাঁর কাছে হয়ে ওঠে এক অসামান্য স্মৃতি।
বুলবুল রানীর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অবদান রাখার পথ একটিমাত্র ছিল না। কেউ অস্ত্র হাতে সম্মুখসমরে লড়েছেন, কেউ তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কেউ আহতদের সেবা দিয়েছেন, আবার কেউ শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রাজশাহীর এক তরুণী থেকে মালদহের মুক্তিযুদ্ধ-সহযোগী হয়ে ওঠা বুলবুল রানীর জীবনকথায় ধরা পড়ে সেই সময়ের ভয়াবহতা, সাহস, মানবিকতা ও দেশপ্রেম। তাঁর স্মৃতিতে সংরক্ষিত রয়েছে একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাস- যে ইতিহাসে আহাজারির পাশাপাশি জেগে ছিল স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।


