জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া বাইগুনি খাল পুনর্খনন প্রকল্পে প্রায় ৫২ লাখ টাকা সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কাজের মান, শ্রমিক নিয়োগ এবং বৃক্ষরোপণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নকশা অনুযায়ী খাল খনন না করেই কাজ শেষ দেখানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র শ্রমিকদের বাদ দিয়ে প্রকল্প সভাপতির স্বজন ও সচ্ছল ব্যক্তিদের শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

উন্নয়নের নামে পরিচালিত এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। বরং নিম্নমানের কাজ, স্বজনপ্রীতি এবং তদারকির ঘাটতির কারণে প্রকল্পটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বর্তমান বিএনপি সরকারের স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করছেন এলাকাবাসীর একাংশ।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৩ মে তালোড়া বাইগুনি এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার দীর্ঘ খাল পুনর্খননের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫২ লাখ টাকা এবং কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ২৯ জুন। সরকারি শিডিউল অনুযায়ী খালের ওপরের প্রস্থ ২০ ফুট (কিছু এলাকায় ১৫ ফুট), তলদেশের প্রস্থ ৮ ফুট এবং গভীরতা ৫ ফুট থাকার কথা।

খালের শুরুতে অল্প কিছু অংশ ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় নির্ধারিত প্রস্থ ও গভীরতা বজায় রাখা হয়নি। কোথাও ওপরের প্রস্থ ১৫ ফুট, কোথাও ১৯ ফুট হলেও গড়ে তা শিডিউলের চেয়ে কম। তলদেশের প্রস্থও অনেক স্থানে ৬ ফুটের নিচে। প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় খননের স্পষ্ট কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ অংশজুড়ে কচুরিপানা অপসারণ না করায় পানি চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রকল্পে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে মাত্র কয়েকটি চারা রোপণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই খাতে সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার কাজ হয়েছে।

এদিকে প্রকল্পে ১২৫ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও বাস্তবে ৫০ থেকে ৫৫ জনের বেশি কাজ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শ্রমিক তালিকায় প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেনের ছেলে, ছোট ভাই, চাচাতো ভাই, ভাতিজা ও ভাগিনাসহ অন্তত ২৫ থেকে ২৭ জন স্বজন এবং বিত্তবান ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক জানান, তালিকাভুক্ত অনেকেই মাঠে কাজ করেননি। তাদের নামে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত শ্রমিকরা কাজ ও মজুরি- দুই থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন।

প্রকল্প সভাপতির ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি কাজের তদারকি করেছেন, তবে শ্রমিক তালিকায় তাঁর নাম কীভাবে এসেছে, তা তিনি জানেন না।

স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা ছুমির জালাল বলেন, খননের আগে খালটির অবস্থা এখনকার চেয়ে ভালো ছিল। বর্তমান অবস্থায় বর্ষায় কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। অনিয়মের বিষয়ে অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে চান না।

একই গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, নকশা না মেনে কাজ করায় বর্ষা মৌসুমে খালটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। উন্নয়নের নামে এটি বড় ধরনের অনিয়মের উদাহরণ।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসিবুল ইসলাম বলেন, কাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। সরেজমিনে পরিমাপ করে যতটুকু কাজ পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী বিল দেওয়া হবে। শ্রমিক তালিকা নিয়ে অভিযোগও তদন্ত করা হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হারুনুর রশিদ বলেন, পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত না হলে খাল খননের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এতে আগামী বর্ষায় কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ক্ষতি হতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা জানান, পরিদর্শনে নকশাবহির্ভূত কাজের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নজরে এসেছে। ত্রুটিপূর্ণ অংশ দ্রুত পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version