মাত্র সাত দিনে জামালপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতদের মধ্যে চারজনই নারী ও কিশোরী। রয়েছেন দুই গৃহবধূ, এক কলেজছাত্রী ও এক কিশোরী। অন্যজন একজন ব্যবসায়ী। একের পর এক এমন মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়লেও এসব ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও প্রতিরোধে প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
গত ২৩ আগস্ট জামালপুর শহরের শেখের ভিটা রেলক্রসিং এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ইশরাত জাহান (৩০) নামে এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ফ্ল্যাটে তার দুই শিশুসন্তান দীর্ঘ সময় আটকে থেকে জানালা দিয়ে পানি চেয়ে কান্নাকাটি করলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে দরজা ভেঙে শিশুদের উদ্ধার করার পাশাপাশি একটি কক্ষ থেকে ইশরাতের মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনায় তার স্বামীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এর মাত্র চার দিন পর, ২৭ আগস্ট মাদারগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া পূর্বপাড়া এলাকায় নিজের দোকান থেকে সামিউল ইসলাম ওরফে ফকির আলী (৪৫) নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই দোকানেই রাতযাপন করতেন। দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকার পর পরিবারের সদস্যরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার মরদেহ দেখতে পান।
পরদিন ২৮ আগস্ট সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের একটি কৃষিজমির পাশের সেচপাম্পের ঘর থেকে রূপসী আক্তার (১৬) নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগের রাত থেকেই নিখোঁজ ছিল সে। একই দিন রাতে জামালপুর শহরের দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান রিমা (২৫)-এর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে রিমা মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।
সবশেষ ২৯ আগস্ট নান্দিনা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার (২৬) নামে আরেক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দূর করার মতো দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে দ্রুত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবিও উঠেছে। তাদের মতে, শুধু তদন্তের কথা বললেই হবে না; ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
শহরের বকুলতলা এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, “অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এতগুলো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নারী ও তরুণীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো মানুষকে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা দরকার।”
দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে নিয়মিত অবহিত করা জরুরি।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াহিয়া আল মামুন জানান, প্রতিটি ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে এবং তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় রোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিট পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন মসজিদেও জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, হত্যা ও আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।


