ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাক্ষী হলো দেশটি। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে রাজধানী কারাকাসসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ধসে পড়েছে অসংখ্য ভবন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন হাজারো মানুষ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই দুর্যোগে প্রাণহানি ১০ হাজার ছাড়িয়ে এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বুধবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময়ে প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপে এলাকায়। আতঙ্ক কাটার আগেই কিছুক্ষণের মধ্যে কারাকাস থেকে ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭.৫ মাত্রার আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। পরপর দুটি শক্তিশালী কম্পনে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বহু এলাকা।
রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ। বহু পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে ছুটছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলো।
দুর্যোগের পরপরই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্যও আবেদন জানিয়েছে সরকার।
কারাকাসের বাসিন্দারা জানান, ভূমিকম্পের সময় ভবনগুলো প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জীবন বাঁচাতে ঘরবাড়ি ও অফিস ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ কেউ নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বহু বাড়ির আসবাবপত্র ও মূল্যবান সামগ্রী মেঝেতে ছিটকে পড়ে।
চাকাও জেলার মেয়র গুস্তাভো দুকে জানান, বেশ কয়েকটি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। একটি ধসে পড়া ভবন থেকে অন্তত ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আফটারশকের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের খোলা স্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ফ্যালকন রাজ্যের গভর্নর ভিক্টর ক্লার্ক জানিয়েছেন, অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন এবং ১৫ জন নিখোঁজের সন্ধানে অভিযান চলছে। তবে উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা জানা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির কারণে মাইকুয়েটিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানও স্থগিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলো বলেন, “আমাদের ভবন ও বাড়িঘর ধসে পড়েছে। মানুষের জীবন রক্ষাই এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দেশের সব সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি।”
এদিকে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “এই কঠিন সময়ে ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে দাঁড়াতে আমরা প্রস্তুত।” ইতোমধ্যে জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
ভূমিকম্পের পর পুয়ের্তো রিকো ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ কয়েকটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের আর্তনাদ, স্বজন হারানোর আশঙ্কায় অপেক্ষমাণ অসংখ্য পরিবারের কান্না এবং বিধ্বস্ত শহরের দৃশ্য- সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা আজ এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এই ভূমিকম্প দেশটির জন্য এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি হয়ে উঠতে পারে।


