দেশের সরকারি ও আধা-সরকারি সেবা খাতে দুর্নীতি এখনও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
টিআইবি জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর নমুনা কাঠামোর ভিত্তিতে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১,১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবা গ্রহণকারীদের ৭৬.৬ শতাংশ এবং বিআরটিএ সেবা গ্রহণকারীদের ৬৩.৫ শতাংশ ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। দুর্নীতির মাত্রার দিক থেকে এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা খাত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘুষের সামগ্রিক পরিমাণ বিশাল হলেও পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালে প্রতি পরিবারের গড় ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১২৪ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম।
তবে দুর্নীতির বাস্তবতা এখনও উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক সেবায় দুর্নীতি সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১.৩ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেনি। অধিকাংশের ধারণা, অভিযোগ করেও কার্যকর ফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক পরিবারই জানে না কোথায় এবং কীভাবে দুর্নীতির অভিযোগ করতে হয়।
জরিপে দেখা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে ২৯.৫ শতাংশ পরিবার অবগত থাকলেও সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে জানে মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবার। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
গ্রাম ও শহরের তুলনামূলক চিত্রেও বৈষম্য দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরাঞ্চলে এ হার ৫৮.৫ শতাংশ। তবে শহরবাসীকে তুলনামূলক বেশি অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিআইবি আরও বলেছে, নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সেবা গ্রহণের পথ আরও জটিল ও বৈষম্যমূলক। বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এখনও বহাল রয়েছে।
প্রতিবেদনে বিচারহীনতা, দুর্বল জবাবদিহি ব্যবস্থা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তির পরিবর্তে সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতিকে দুর্নীতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে টিআইবি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জরিপ দেশের সেবা খাতে দুর্নীতির গভীরতা ও নাগরিক ভোগান্তির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে জনসেবার মানোন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।


