চার বছর পূর্ণ করলো দেশের চ্যালেঞ্জিং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু। ২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে সেতুটি শুধু রাজধানী ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই আনেনি, বরং দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে পদ্মা সেতু দিয়ে মোট ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৪টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ সময় টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১১৪ টাকা। পদ্মা সেতুর দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।একসময় উত্তাল পদ্মা নদী পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে অপেক্ষা করতে হতো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের। পদ্মা সেতু সেই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়েছে। এখন রাজধানী ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
সেতুটি শুধু যোগাযোগ সহজ করেনি, বরং কৃষিপণ্য পরিবহন, শিল্পকারখানা স্থাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্র বদলে দিয়েছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন যান চলাচল শুরু হয় পদ্মা সেতুতে। পরে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয় পদ্মা সেতুর রেলপথ। এর মাধ্যমে চালু হয় ঢাকা-ভাঙ্গা নতুন রেল নেটওয়ার্ক।
এরপর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা, নড়াইল ও যশোর হয়ে সরাসরি খুলনা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে রাজধানী থেকে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় খুলনা ও বেনাপোল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এখন একসঙ্গে সড়ক ও রেলপথের সুবিধা ভোগ করছেন।
পদ্মা সেতুর বহুমুখী ব্যবহার দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সেতু প্রকল্পের আওতায় নির্মিত খুঁটি ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া সেতুর ওপর দিয়ে উচ্চক্ষমতার ইন্টারনেট সংযোগ পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে সেতুর মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথম বছর (২৬ জুন ২০২২ – ২৪ জুন ২০২৩): যানবাহন পারাপার: ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৯টি, টোল আদায়: ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ টাকা
দ্বিতীয় বছর (২৫ জুন ২০২৩ -২৪ জুন ২০২৪): যানবাহন পারাপার: ৬৮ লাখ ১ হাজার ৩৭৪টি, টোল আদায়: ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫০ টাকা
তৃতীয় বছর (২৫ জুন ২০২৪-২৪ জুন ২০২৫): যানবাহন পারাপার: ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি, টোল আদায়: ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ২ হাজার ৫৫০ টাকা
সব মিলিয়ে চার বছরে টোল আদায় ৩৩০০ কোটির বেশি এবং যানবাহন পারাপার প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখে পৌঁছেছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর বিভিন্ন ঈদ মৌসুমে টোল আদায়ে একাধিক রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৫ সালের ঈদুল আজহার আগে ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় সেতু দিয়ে ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন পারাপার হয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ওই দিন টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা একদিনে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড।
এর পরদিন ৬ জুন ৪০ হাজার ১১৮টি যানবাহন পারাপারের বিপরীতে টোল আদায় হয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা।
এর আগে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল একদিনে ৪৫ হাজার ২০৪টি যানবাহন থেকে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা টোল আদায় হয়েছিল। একই বছরের ১৪ জুন ৪৪ হাজার ৩৩টি যানবাহন থেকে আদায় হয় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। যদিও প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগ প্রায় ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ১৪০টি কিস্তির মাধ্যমে এই ঋণ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ঋণ পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত তা চলবে।
বর্তমানে পদ্মা সেতু ও দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কে আধুনিক নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেতুতে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দুই প্রান্তের এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।চার বছরে পদ্মা সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, বরং বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, সক্ষমতা ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টোল আদায়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, রেল যোগাযোগের সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার প্রমাণ করছে পদ্মা সেতু দেশের উন্নয়নযাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।


