অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮২ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ১৮ মাসে চিকিৎসা বাবদ তিনি মোট ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকার বিল গ্রহণ করেছেন।
জানা যায়, হৃদরোগজনিত জটিলতার চিকিৎসার জন্য তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় এবং অপারেশনে ঝুঁকি থাকায় বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন খালিদ হোসেন।তিনি জানান, সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিয়েই গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে দুই দফায় থাইল্যান্ডে যান। সেখানে অস্ত্রোপচারও করানো হয়। প্রথম সফরে তার সঙ্গে একজন চিকিৎসক এবং দ্বিতীয় সফরে মেয়ে ও জামাতা ছিলেন।খালিদ হোসেন বলেন, “আমার এখনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে। তবে চিকিৎসার ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় আবার বিদেশে যেতে পারছি না।”
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে খালিদ হোসেন বলেন, “নিশ্চয়ই ব্যর্থতা রয়েছে। এত বছরেও আমরা আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারিনি। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার হয়েছে, অথচ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সেই অর্থ ব্যয় করা হয়নি। দেশে উন্নত চিকিৎসা থাকলে কেউ বিদেশে যেত না। চিকিৎসার জন্য আমার নিজেরও অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এটি কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন কি না – এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শুধু ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করা যায় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা কাজ করে।”
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন খালিদ হোসেন।সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, যিনি চিকিৎসা বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা নিয়েছেন।
এ ছাড়া অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা, সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা, সাবেক বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান নিয়েছেন ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা, সাবেক ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ নিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা, সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা এম আমিনুল ইসলাম নিয়েছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা এবং সাবেক খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি অসুস্থ হলে সরকার তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারে। প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদনও দেওয়া যেতে পারে। তবে এটি কোনো নিয়মিত ভাতা নয়; নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অর্থ গ্রহণ করতে হয়।
তিনি বলেন, “অসুস্থতার প্রমাণপত্র ও প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার শর্তেই চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করা হয়। যদি বিল-ভাউচার ছাড়া অর্থ ছাড় করা হয়ে থাকে, তাহলে তা নিয়মবহির্ভূত। শুধু অর্থ গ্রহণকারী নন, যারা অনুমোদন ও ছাড় দিয়েছেন তারাও দায় এড়াতে পারেন না।”
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারা, কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করেছেন তা খতিয়ে দেখে দায় নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বিদেশ সফরের মতো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মত দেন।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। বিশেষ করে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ১৫ থেকে ১৭ লাখ বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরও বাংলাদেশি রোগীদের জনপ্রিয় গন্তব্য। স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষায়িত চিকিৎসার ঘাটতি এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাবের কারণে বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।


