পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস (টিএসসি) এখন ক্রমেই গভীর সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা সামলানোর আগেই দলটির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীকোন্দল এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার পদত্যাগ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবই আজ তৃণমূলের এই দুর্বল অবস্থার অন্যতম কারণ।
ঋতব্রত, সন্দীপন, ফিরহাদ হাকিম এবং জাভেদ খানের মতো প্রভাবশালী নেতাদের দলত্যাগের পর এবার বড় ধাক্কা দিলেন দলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি রাজ্য সভাপতিসহ দলের সব সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দলীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দিয়ে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, গত ৩ জুন যে দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছিল, তা থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। পাশাপাশি তৃণমূল এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের ব্যাংক হিসাবের সিগনেটরি হিসেবে থাকা দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি চেয়েছেন।
যদিও পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট কারণ তিনি প্রকাশ করেননি, তবে রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘চেয়ারপারসন’ হিসেবেও উল্লেখ না করাকে অনেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, আর্থিক অনিয়ম এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ দলটির সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ জমা হলেও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে তা প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হচ্ছে।
পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থান। তাঁর ছেলে সৌরভ বসু ইতোমধ্যেই ঋতব্রতপন্থী নব্য তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয় যে, চন্দ্রিমাও কি মমতা শিবির ছেড়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে যোগ দেবেন? তাঁর সাম্প্রতিক পদত্যাগ সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
এদিকে দলীয় কার্যালয় নিয়েও নাটকীয় পরিবর্তনের খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূল ভবনের নিয়ন্ত্রণ এখন ঋতব্রতপন্থী নব্য তৃণমূলের হাতে বলে দাবি করা হচ্ছে। কার্যালয়ে নতুন ব্যানার টাঙানো হয়েছে, যেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে অরূপ রায়ের নাম থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ও ছবি নেই। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল সাংগঠনিক পরিবর্তন নয়; বরং দলের ভেতরে ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তনেরও স্পষ্ট বার্তা।
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দলটি এখন নেতৃত্ব সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের চাপে অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছে। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ সেই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- তৃণমূল কি এই ভাঙন সামলে পুনর্গঠিত হতে পারবে, নাকি দুর্নীতি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভারে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শিবির?


