২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ক্যাডারের অন্তত ৩৩ জন কর্মকর্তা এবং প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩ জন সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) বর্তমানে এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়তে যাচ্ছেন। বিষয়টি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠানোর ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। বিসিএস ২০তম ব্যাচের এসব কর্মকর্তা ২০০১ সালের ৩১ মে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। সেই হিসেবে গত ৩০ মে তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্বঘোষিত অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা এটি। এর আগে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় দায়িত্বে থাকা ২২ জন জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করা জেলা পুলিশ সুপারদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রথম ধাপে এসব কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। বর্তমানে তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ওএসডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবার তাদের স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রশাসনের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
বাধ্যতামূলক অবসরের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান, নারায়ণগঞ্জের হারুন অর রশীদ, কুমিল্লার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, চাঁদপুরের জিহাদুল কবির, নরসিংদীর মিরাজ উদ্দিন আহমেদ, গাজীপুরের ড. শামসুন্নাহার, চট্টগ্রামের নূরে আলম মিনা, বরিশালের সাইফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জের মাশরুকুর রহমান খালেদসহ বিভিন্ন জেলার সাবেক পুলিশ সুপাররা।
এ ছাড়া নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাঙামাটি, ঠাকুরগাঁও, সুনামগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, মাগুরা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, সিলেট, পাবনা, পঞ্চগড়, শরীয়তপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপাররাও এই তালিকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩ জন সাবেক জেলা প্রশাসক, যারা বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় ওএসডি হিসেবে রয়েছেন, তারাও একই ধরনের সিদ্ধান্তের আশঙ্কায় রয়েছেন। তাদের অনেকেই ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে গত এক দশকের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ একযোগে চাকরি হারাবেন। ফলে সরকারি প্রশাসনের অভ্যন্তরে নতুন করে পুনর্বিন্যাস ও পদায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য অবসরের খবরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এখন দৃষ্টি সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


