মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলমান কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে রাজধানী কুয়ালালামপুরের চেরাস এলাকার তামান মালুরি রাতের বাজারে (পাসার মালাম) ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ (জেআইএম)। অভিযানে বাংলাদেশিসহ সাতটি দেশের মোট ২০০ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) সন্ধ্যায় পরিচালিত এই অভিযানে অভিবাসন বিভাগের সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে বাজারজুড়ে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। সন্দেহভাজন অনেক অভিবাসী বিভিন্ন দিকে পালানোর চেষ্টা করলেও আগে থেকেই কৌশলগত অবস্থানে থাকা কর্মকর্তারা দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলেন এবং আটক করেন।
আটক হওয়া অধিকাংশ বিদেশি নাগরিক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও প্রস্তুত খাবার কিনতে বাজারে এসেছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাজারটিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিক ও অভিবাসীর উপস্থিতি ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং প্রায় দুই সপ্তাহের গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে ‘অপ কুটিপ’ নামে বিশেষ এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। কুয়ালালামপুর ও পুত্রাজায়ার অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় তাদের সহযোগিতা করে কুয়ালালামপুর সিটি হল (ডিবিকেএল)।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে কয়েকটি স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) বাজারের বিভিন্ন প্রবেশপথ ঘিরে ফেলে। একই সময়ে সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশে আগে থেকেই বাজারে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তারা অভিযান শুরু করেন। ফলে অনেকেই পালানোর সুযোগ পাননি।
কুয়ালালামপুর অভিবাসন বিভাগের পরিচালক হামশা ইনজাউ জানান, অভিযানের সময় মোট ৫০০ জনের পরিচয়পত্র ও ভ্রমণসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হয়। এর মধ্যে ৪০৭ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৯৩ জন মালয়েশিয়ার নাগরিক ছিলেন।
তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে মোট ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২৫ জন পুরুষ এবং ৭৫ জন নারী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান ও ভারতের নাগরিক রয়েছেন।
হামশা ইনজাউ আরও জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগে জানা যায়, ওই এলাকায় নিয়মিত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের সমাগম ঘটে। এসব তথ্য যাচাই করেই পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিবাসন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা, বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকা, অনুমোদিত পাসের অপব্যবহার, পাসের শর্ত লঙ্ঘনসহ ১৯৫৯/৬৩ সালের অভিবাসন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কুয়ালালামপুর সিটি হলের (ডিবিকেএল) এনফোর্সমেন্ট পরিচালক মোহদ মুজ্জামের জামালউদ্দিন জানিয়েছেন, তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আটক হওয়া অধিকাংশ বিদেশি ওই বাজারে মূলত ক্রেতা হিসেবেই উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হামশা ইনজাউ বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। শুধু অবৈধ অভিবাসীদের নয়, তাদের নিয়োগদাতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক, দালালচক্র, এজেন্ট এবং যারা অবৈধভাবে বিদেশিদের আশ্রয় বা সহযোগিতা দেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, “অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করেই আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
একই সঙ্গে তিনি সাধারণ জনগণকে অভিবাসন আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
এদিকে মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক ও প্রবাসীদের পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি হালনাগাদ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করলে ভবিষ্যতে আইনগত জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।


