প্রবল বর্ষণে কক্সবাজারে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এছাড়া কক্সবাজার শহরেও পাহাড়ধসে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। রবিবার (৫ জুলাই) দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত পৃথক কয়েকটি ঘটনায় এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, টানা ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটের দিকে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। ঘটনাস্থলেই চাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। দুর্ঘটনায় আরও দুইজন আহত হন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিনজনের মরদেহ এবং দুইজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পর রাত প্রায় ১টা ৪৫ মিনিটে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।
পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটির স্রোতে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামের এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত একরাম ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের ছেলে। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, দুর্ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন।
রাত প্রায় ৩টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ চারজন নিহত হন এবং আহত হন আরও একজন।
নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)। প্রবল বর্ষণের কারণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তাদের বসতঘরের ওপর পড়ে গেলে তারা মাটিচাপা পড়েন।
শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই নয়, কক্সবাজার শহরেও পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোররাত ৪টার কিছু পর শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের তিনজন মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাদের বের করে আনেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় আলী আকবরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, টানা ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। তিনি সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আরও দুইদিন ভারি বর্ষণের আশঙ্কা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১৫০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী আগামী আরও দুইদিন ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
এ অবস্থায় পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


