৪৫ পৃষ্ঠার যৌথ ঘোষণাপত্রে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, ডলারের বিকল্পে নিজস্ব মুদ্রা ও বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্বের অঙ্গীকার

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তি ও প্রভাব আরও জোরালো করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ব্রিকসের মহাসম্মেলন। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জোটের নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ নামে ৪৫ পৃষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছেন। স্বাগতিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণাপত্রটি অনুমোদনের কথা জানান।

বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যব্যবস্থা ও বৈশ্বিক শাসনকাঠামো নিয়ে ব্রিকসের এই সম্মিলিত অবস্থানকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে জোটটির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে জি৭ (G7)-এর মতো উন্নত অর্থনীতির জোটের পাশাপাশি ব্রিকস উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব ও অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে নিজেদের ভূমিকা জোরদার করার বার্তা দিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি

যৌথ ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্রিকসের সদস্য এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল ও ভারতের আরও বড় ভূমিকার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের দাবিকে আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এনেছে জোটটি।

ডলারের বিকল্পে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সদস্য দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাব ও পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার বিপরীতে ব্রিকসের এই অবস্থান জোটটির অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং বিকল্প আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করছে।

যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও নৌপথের নিরাপত্তা

ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফাভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নাবিক ও বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্রিকস নেতাদের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপদ বাণিজ্যপথ এবং সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় জোটটির অভিন্ন উদ্বেগকে তুলে ধরেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধ ও সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা

বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে ঘোষণাপত্রে ঢালাওভাবে শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বাধা বাড়ানোর সমালোচনা করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার অজুহাতে সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যব্যবস্থার প্রসার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিকস নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের বাণিজ্য-প্রতিবন্ধকতা বৈশ্বিক বাণিজ্য আরও সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এসব প্রবণতা বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলেও ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘পুরোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে নতুন বিশ্ব পরিচালনা সম্ভব নয়’: মোদি

ঘোষণাপত্র গ্রহণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, পরিবর্তিত বিশ্বকে পুরোনো ধাঁচের প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। প্রতিনিধিত্ব, সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সংস্কার এখন অপরিহার্য।

ভবিষ্যতের প্রযুক্তি এবং সেগুলো পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়নে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মোদি বলেন, ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ ব্রিকসের দেশগুলোর যৌথ অঙ্গীকারকে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এখন এসব সিদ্ধান্তকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করার দায়িত্ব তাদের।

G7-এর বাইরে নতুন বৈশ্বিক শক্তির উত্থান?

ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর যে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে, তা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে জোটটির উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। জি৭ যেখানে বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ উন্নত অর্থনীতির সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, সেখানে ব্রিকস নিজেদের উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

তবে প্রভাবের প্রশ্নে শুধু ঘোষণাপত্র নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতাই হবে মূল পরীক্ষা। নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমন্বয়, অভিন্ন নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে ব্রিকসের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ সেই সম্ভাবনার দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা দিয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version