‘গাজওয়াতুল হিন্দ’-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিস্ফোরক তৈরির অনুশীলন ও মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)-এর প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরকে ফের তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার হোসাইন তানিমকেও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন দিনের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহ আমানত সাবির ইসলামী উগ্রবাদী মতাদর্শে জড়িয়ে পড়েছেন বলে তাদের ধারণা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত তার বা গ্রেপ্তার হওয়া অন্যদের সঙ্গে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি পটকার উপকরণ ব্যবহার করে বিস্ফোরক তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে নির্জন স্থানে বিস্ফোরণ ঘটাতে দেখা যায়। ভিডিওতে বিস্ফোরণের পর ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি এবং উসকানিমূলক বক্তব্যও শোনা যায়, যা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, ভিডিওতে প্রদর্শিত বিস্ফোরকটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এটি পটকার উপকরণের সঙ্গে দাহ্য রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ভিডিওটি সম্পাদনার মাধ্যমে বিস্ফোরণের শব্দও বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে তাদের সক্ষমতা বেশি বলে প্রতীয়মান হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সাবির আরও দাবি করেছেন, তারা কোনো জঙ্গি সংগঠনের সদস্য নন; বরং ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’-এর সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে ‘ম্যাক ইউরি’ নাম বা ছদ্মনামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ওই ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান শনাক্তে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাতে খুলনায় এক ইজিবাইক চালককে ছিনতাই করার পর হত্যার ঘটনা ঘটায়। পুলিশের দাবি, ওই চালককে তারা ‘বিধর্মী’ এবং একটি ‘হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য’ মনে করে এই অপরাধ সংঘটিত করেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে সাবির।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া চারজন- জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, আবিদুর রহমান ও বায়োজির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য মেলেনি বলে জানিয়েছে সিটিটিসি। ফলে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়নি এবং আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন।
এদিকে গ্রেপ্তার আতাউল্লাহ শাহ গাজীপুর মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গ্রেপ্তারের পরই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে এনসিপি।
ভিডিওটি প্রকাশের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবিরের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ডানপন্থি ঘরানার ব্যক্তিদের প্রচারণা দেখা গেলেও বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশের পর তাদের অনেকেই অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। আলোচিত উগ্রবাদী বক্তা আতাউর রহমান বিক্রমপুরী ও আসিফ আদনানও পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে লিখেছেন, ভিডিওটি বাস্তব এবং বিস্ফোরক আইনে বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। সাবিরের বক্তব্য, ভিডিওর উৎস, সম্ভাব্য সহযোগী, অর্থায়ন এবং উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না- এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।


