মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কার্যত আর কার্যকর নেই। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না এবং দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনাকে তিনি ‘সময়ের অপচয়’ বলে মনে করেন।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয়, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। আমি ইরানের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তারা জঘন্য। তাদের সঙ্গে কাজ করা শুধু সময়ের অপচয়, কারণ তারা বারবার মিথ্যা বলে।” যদিও তিনি স্বীকার করেন, দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে, তবে সেই আলোচনায় ইতিবাচক কোনো ফল আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
উত্তেজনার সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায়। এর জেরে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে।
ন্যাটো সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের শাসকগোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনা করে তাদের ‘দুষ্ট’, ‘অসুস্থ’ ও ‘পাগল’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “এরা ক্যান্সারের মতো। ক্যান্সার শুরুতেই থামিয়ে দিতে হয়।” একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন স্থাপনায় হামলার ঘটনাকে তিনি ইরানের আগ্রাসী নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল এবং লেবাননে হিজবুল্লাহকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে যুদ্ধবিরতির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
আরাগচি বলেন, ইরান তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেকোনো হামলার উৎস ও উৎপত্তিস্থলকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৮০টির বেশি সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত ৮৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তাদের নৌ ও মহাকাশ বাহিনী যৌথভাবে বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিও হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করা হয়।
হামলার পর বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ হওয়ার ঘোষণা এবং ইরানের পাল্টা কঠোর অবস্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই দেশের বক্তব্যে আপসের কোনো ইঙ্গিত নেই। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।


