রংপুর মহানগরীর দাসপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটন, অধিকতর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট দেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সোমবার বিকেলে মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন কুমার চ্যাটার্জী ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবির পরিদর্শক ওসি জিনাত আলীর কাছে মামলার নথিপত্র, আলামত ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় তথ্য হস্তান্তর করেন।
পরে সন্ধ্যায় সাবেক ও নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল দাসপাড়ায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান। সেখানে মিলন কুমার চ্যাটার্জী প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।
মিলন কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার সব নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলও একসঙ্গে পরিদর্শন করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী তদন্তভার হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে। মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলীকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবেন।
এদিকে চার হিন্দু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিকরা। পুলিশের বক্তব্যের প্রতিবাদে সোমবার রাতে রংপুর নগরীতে মশাল মিছিল করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এর আগে বিকেলে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ঘটনার বিভিন্ন দিকের ব্যাখ্যা দাবি করেন। বিশেষ করে ঘটনার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি কীভাবে ঘটেছিল, তা স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্য হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের দেওয়া বক্তব্য তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার দাবি, ঘটনার পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। সব সম্ভাব্য দিক বিবেচনায় নিয়ে গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।
গত শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর মহানগরীর দাসপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, গণপতি চক্রবর্তী অভিযুক্তদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দিয়েছিলেন। এ বিরোধের জেরেই তাকে, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তরের পর এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয় নতুন করে যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


