দেশজুড়ে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহসংকটের পাশাপাশি একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন কমে গেছে। ফলে চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর- বাড়ছে লোডশেডিং, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতি সরকারের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের দুর্বলতাকেও নতুন করে সামনে এনেছে। প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশের মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে- যা বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংকটেরই বড় উদাহরণ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশের ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে পুরোপুরি সক্ষম ছিল না। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। অন্য কেন্দ্রগুলোও সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।
ফলে বৃহস্পতিবার দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও ব্যবস্থাপনার সংকটে উৎপাদন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে সরকারের বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাসসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও সংকট কাটেনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার এলএনজি থেকে সরবরাহ নেমে আসে ৭৪ কোটি ঘনফুটের নিচে। সব মিলিয়ে গ্যাসের মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্প, রান্না ও পরিবহন খাতেও গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহেও ঘাটতি রয়েছে। দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বৃহস্পতিবার উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম।
কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও কারিগরি সমস্যা রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমিয়েছে।
জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহস্বল্পতা ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে লোডশেডিংয়ের চাপ মূলত ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের ওপর বেশি থাকলেও ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানীতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকায় নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত পরিমাণ লোডশেডিং করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে দুর্ভোগ বাড়ছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। জেনারেটর নষ্ট থাকায় লোডশেডিংয়ের সময় লিফটে আটকে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস না থাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে দেশের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতির আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে একই এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বুধবার রাত ১২টায় সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু আরইবির এলাকাতেই লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, সংকটের বড় চাপটি এখনো দেশের গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার গ্রাহকদের ওপরই পড়ছে।
দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদার সময় হাজার হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এর আগে চলতি মাসে ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল। ৯ আগস্ট থেকে টানা প্রায় এক সপ্তাহ গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। কিছুটা কমার পর গত দুই দিনে আবারও তা বেড়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ রয়েছে। আদানি থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না। তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক জ্বালানি সংকট নয়; বরং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘাটতির ফল কি না- সে প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে।


