শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নজিরবিহীন শাস্তি, ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক নির্বাহী পরিচালক, দুই পরিচালকসহ ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় আরও পাঁচ কর্মকর্তার বেতনবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বাতিল করে তাদের সংশ্লিষ্ট পদে বেতনস্কেলের নিম্নস্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বাধ্যতামূলক অবসরের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে বিএসইসি। এর এক দিন আগে, মঙ্গলবার পাঁচ কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএসইসি প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এতসংখ্যক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের ৫ মার্চ তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করে প্রতিবাদ এবং অফিসের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তিনি সে সময় বিএসইসি কর্মকর্তাদের ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।

সাইফুর রহমানকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে পরদিন একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করতে যান। একপর্যায়ে তারা অনুমতি ছাড়া কমিশন সভাকক্ষে প্রবেশ করেন এবং কর্মকর্তাদের একটি অংশ উচ্চস্বরে ব্যাখ্যা দাবি করেন।

তৎকালীন চেয়ারম্যানের অভিযোগ ছিল, তাকে ও কমিশনারদের চার ঘণ্টারও বেশি সময় দপ্তরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত সেনাসদস্যদের সহায়তা নেওয়া হয়।

বিএসইসি সূত্র অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম, পরিচালক আবুল হাসান ও পরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মজুমদার।

অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে রয়েছেন নজরুল ইসলাম ও মোল্যা মো. মিরাজ উস সুন্নাহ। যুগ্ম পরিচালক রাশেদুল আলমকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া উপপরিচালকদের মধ্যে মো. নান্নু ভূঞা, কাজী মো. আল-ইসলাম, সহিদুল ইসলাম, বনী ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হাসান রয়েছেন।

সহকারী পরিচালকদের মধ্যে আমিনুল হক খান, আবদুল বাতেন ও সাজ্জাদ হোসেনকে একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, কাওসার পাশা বৃষ্টি ও সমীর ঘোষও বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় রয়েছেন।

ঘটনার পর ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় মামলাও করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তত্ত্বাবধানে তদন্তে অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী- উভয় পক্ষের বক্তব্য ও সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

তদন্ত শেষে মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা বিএসইসিতে পাঠানো হয়। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং পাঁচ কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার তাদের মৌখিকভাবে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বুধবার আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হলে অনেকেই চিঠি সংগ্রহের জন্য আগারগাঁওয়ে বিএসইসির প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হন।

বিএসইসিতে ওই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পরদিন, ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা আসে।

এ ঘটনায় নির্বাহী পরিচালক মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। তবে ঘটনার পর তিনি স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করে বিএসইসি ত্যাগ করায় তার বিরুদ্ধে নতুন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে বিএসইসিতে এককভাবে বাধ্যতামূলক অবসরের ঘটনা ঘটলেও একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তাকে এ ধরনের কঠোর শাস্তি দেওয়ার নজির নেই। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান এবং ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়াকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version