বীণা সিক্রির কলাম
চলতি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্ধারিত নয়াদিল্লি সফর আকস্মিকভাবে বাতিল হওয়াকে ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে কোনো সফররত সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানানোর আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মহড়া পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর সফর স্থগিত হওয়া নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা।
কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুযায়ী, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সফর বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। কিন্তু ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রে বিষয়টি কতটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শুধু ‘কূটনৈতিক অনভিজ্ঞতা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন
এ ঘটনাকে কেবল সদ্য ‘নির্বাচিত’ সরকারের ‘কূটনৈতিক অনভিজ্ঞতা’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের পরপরই, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ভারত সফরের জন্য ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানান। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা সেই আমন্ত্রণপত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন। সে সময় বাংলাদেশ থেকে এমন প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়েছিল যে, নয়াদিল্লিই হবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। কিন্তু সেই আমন্ত্রণের এখনো আনুষ্ঠানিক জবাব না পাওয়া কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
আগস্টের শুরুতে ভারত থেকে দ্বিতীয় একটি আমন্ত্রণও জানানো হয়। এবার BIMSTEC-এর চেয়ারপারসন হিসেবে ভারতের আয়োজিত BRICS সম্মেলনের ১২-১৩ সেপ্টেম্বরের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দুটি আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলে আমন্ত্রণ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের পরিবর্তে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের মাধ্যমে নানা বক্তব্য সামনে আসতে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পরস্পরবিরোধী বার্তা তৈরি হয়েছে। এতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হতে পারে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতিগত প্রশ্ন
২০ আগস্ট বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ভারতকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের জন্য ‘অনুকূল’ বা ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে- দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কি একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান বা একটি আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ হয়ে থাকবে?
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বাংলাদেশের তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব এবং বর্তমানে ‘নির্বাচিত’ রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যটি এ ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা না হলেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি বাধা হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সামগ্রিক সম্পর্ক যেন কোনো একটি ইস্যুর কাছে ‘জিম্মি’ না হয়ে পড়ে। আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখি এবং আশা করি, ভবিষ্যতেও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। বাংলাদেশ সরকারও জানে, প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং তা সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাহলে কি এর অর্থ দাঁড়ায় যে এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্ভব নয়?
শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বিভিন্ন বক্তব্যে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। ভারত ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি কার্যকর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা সম্ভব। সুতরাং, একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আটকে রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটিই বরং আলোচনার বিষয়।
‘মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ’- বার্তাটি কী?
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের ‘মানসিকতা’ বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর সম্পর্কের অগ্রগতি নির্ভর করছে এমন বক্তব্যও সামনে এসেছে। এ ধরনের বক্তব্য কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কেবল আবেগ, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা পারস্পরিক অভিযোগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সম্পর্ক টেকসই হয় পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা, যোগাযোগ এবং বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে।
ভারতের অবস্থান
বাংলাদেশে ‘নতুন’ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযম ও কৌশলগত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি পর্যটন ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে এবং পানি সম্পদ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারত প্রস্তুত রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি সংকটঃ সহযোগিতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র
বাংলাদেশের বর্তমান অন্যতম বড় উদ্বেগ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। শিল্প ও কৃষি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবহন খাত সমস্যার মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির পাশাপাশি গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই সংকট বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখানে ভারতের সঙ্গে বাস্তব সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের অনুরোধের পর বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগও হয়েছে। আগস্টের শুরুতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব নয়াদিল্লি সফর করে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের পর এটি দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বর্তমানে ভারতীয় বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এগুলোই দুই দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনতে পারে এমন ক্ষেত্র।
অভিযোগ নয়, প্রয়োজন বাস্তব সহযোগিতা
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় এবং কোন বিষয়টি জাতীয় স্বার্থে কার্যকর, সেই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা। স্থানীয় মৌলবাদীদের কাছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া সহজ হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে সেই দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কূটনীতি হতে পারে না। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি।
প্রধানমন্ত্রীর সফর হবে কি হবে না তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সফরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝি যেন দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণ যথেষ্ট পরিণত। তারা নিজেদের প্রকৃত স্বার্থ কোথায় নিহিত, তা বোঝার সক্ষমতা রাখে।
ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে আন্তরিকভাবে কাজ করার উদ্যোগ এলে ভারত ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে এটাই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি।
বীনা সিক্রি
বিখ্যাত কূটনীতিক ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত


