চট্টগ্রামে মাদক পাচারে এবার ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের। পরিবারের অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দুই শিশুকে দিয়ে পেটের ভেতর ইয়াবা বহন করানোর ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে পাচারের সময় ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকে হেফাজতে নিয়ে তাদের পেট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা। এ ঘটনায় শিশু দুটিকে মাদক পরিবহনে ব্যবহারের অভিযোগে শারমিন আকতার ওরফে ইসমত আরা নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে র‌্যাব-৭-এর সিপিসি-৩-এর কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. তাওহীদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি মাদকচক্র দীর্ঘদিন ধরে পাচারের কৌশল বদলে শিশুদের ব্যবহার করছে। সাধারণ যাত্রী হিসেবে যাতে তাদের দেখে সন্দেহ না হয়, সে জন্য শিশুদের সঙ্গে একজন নারীকে রাখা হয়। পরিবারের খরচ বহনের পাশাপাশি শিশুদের দেওয়া হয় ৮ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব আনোয়ারা উপজেলার সরকারহাট এলাকায় তল্লাশিচৌকি বসায়। সেখানে একটি সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে শারমিন আকতারকে আটক করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা দুই শিশুকে সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে এক্স-রে পরীক্ষায় পেটের ভেতরে ইয়াবা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন চিকিৎসকেরা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার মাধ্যমে শিশু দুটির পেট থেকে ইয়াবার প্যাকেট বের করা হয়। র‌্যাব জানায়, ৯ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৭টি প্যাকেট এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৬টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব প্যাকেটে ছিল ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা।

দুই শিশুর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদমে। অর্থের বিনিময়ে তাদের এই কাজে রাজি করানো হয়। পেটের ভেতরে ইয়াবা বহনের কারণে যেকোনো সময় প্যাকেট ছিঁড়ে গেলে বা মাদক শরীরে ছড়িয়ে পড়লে প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।

র‌্যাব কর্মকর্তা তাওহীদুল ইসলাম জানান, চিকিৎসকদের মতে, শিশু দুটির পেটে ইয়াবা থাকায় তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ফলে মাদক পাচারের এই পদ্ধতি শুধু অপরাধ নয়, শিশুদের জীবনকে সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল।

জিজ্ঞাসাবাদে শারমিন আকতার শিশুদের পেটে ইয়াবা বহনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব। তাঁর দাবি, উখিয়া থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে শিশু দুটিকে কৌশলে সেবন করিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসছিলেন তিনি।

র‌্যাবের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে শারমিন আরও জানিয়েছেন- এর আগেও একই পদ্ধতিতে ওই দুই শিশুর পেটে করে দুই দফায় ইয়াবার চালান উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় শুধু একজন নারীকে গ্রেপ্তার করেই থেমে থাকছে না র‌্যাব। শিশুদের ব্যবহার করে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে মাদক পরিবহনে অপরাধীরা যে ক্রমেই নতুন ও ভয়ংকর কৌশল নিচ্ছে, দুই শিশুর পেটে ইয়াবা বহনের ঘটনা তারই উদ্বেগজনক উদাহরণ। আগে নানা মাধ্যমে মাদক পরিবহনের ঘটনা সামনে এলেও এবার শিশুদের শরীরকেই পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

শিশুদের সরলতা, বয়স এবং তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাভাবিক সন্দেহের ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এই কৌশল নিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

র‌্যাব অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে কোনো শিশু কিংবা কিশোরকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করতে না পারে অপরাধীরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version